প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় মা দিবস। মায়ের কোল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, আর ‘মা’ শব্দটি এক অক্ষরের এক বিশাল মহাকাব্য। সন্তানের অস্তিত্বের উৎস এবং নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী এই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘মা দিবস’। যদিও মায়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ হয় না, প্রতিটি দিনই মায়ের- তবুও একটি বিশেষ দিনে ঘটা করে তাকে ভালোবাসা জানানোর রীতিটি বেশ পুরনো এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
মা দিবস পালনের সূচনা হয়েছিল সুদূর প্রাচীন গ্রিসে। সেখানে দেবতাদের জননী হিসেবে কথিত সম্রাজ্ঞী রিয়া-র (সম্রাট ক্রোনাসের স্ত্রী) সম্মানে বসন্তকালীন উৎসবের মাধ্যমে মাকে অভিনন্দন জানানো হতো। পরবর্তীতে ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডে ‘মায়ের রোববার’ বা ‘মাদারিং সানডে’ পালনের প্রথা শুরু হয়। এটি পালিত হতো যিশু খ্রিষ্টের পুনরুত্থান দিবস বা ‘ইন্টার’ (ইস্টার)-এর আগের ৪০ দিনের চতুর্থ রোববারে।
সে সময় ইংল্যান্ডের দরিদ্র মানুষ ধনীদের বাড়িতে ভৃত্য হিসেবে কাজ করত। কর্মস্থল থেকে ঘরের দূরত্ব বেশি হওয়ায় তারা মালিকের বাড়িতেই থাকত। কিন্তু এই বিশেষ দিনে তাদের ছুটি দেয়া হতো যাতে তারা মায়ের সাথে সময় কাটাতে পারে। মায়েদের জন্য তারা উপহার হিসেবে নিয়ে যেত বিশেষ ‘মাদারিং কেক’, যা পুরো পরিবেশকে উৎসবমুখর করে তুলত। ধীরে ধীরে এই প্রথা পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হিসেবে এটি ‘মাদার চার্চ’ নাম পায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৭২ সালে লেখক জুলিয়া ওয়ার্ড হো শান্তির জন্য মা দিবস পালনের প্রস্তাব করেন এবং বোস্টনে সভা আয়োজন করেন। তবে আধুনিক মা দিবসের প্রকৃত রূপকার আনা জারভিস।
১৯০৭ সালে (মতান্তরে ১৯৭০-এর দশকের সূচনা লগ্ন থেকে প্রচার) ফিলাডেলফিয়া থেকে আনা জারভিস তার মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীকে স্মরণীয় করতে গির্জাকে রাজি করিয়ে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালন শুরু করেন। ১৯১১ সালে এই আবেদন জাতীয়ভাবে গৃহীত হয় এবং ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ঘোষণা দেন যে, মে মাসের দ্বিতীয় রোববার হবে ‘মা দিবস’ এবং এটি হবে একটি সরকারি ছুটির দিন। বর্তমানে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ইতালি, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া ও বেলজিয়ামসহ বিশ্বের অনেক দেশ এই দিনটি পালন করে।
বাংলাদেশে মা দিবস পালনের পরিসর ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও পশ্চিমা সংস্কৃতি হিসেবে অনেকে একে বাঁকা চোখে দেখেন- তাদের মতে, এটি উন্নত বিশ্বের কালচার যারা মা-বাবাকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে মা প্রতি মুহূর্তের নিঃশ্বাসের উপাদান।
তবে দিবসটি পালনের পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে, আর তা হলো- ‘উদ্বুদ্ধকরণ’। আধুনিকতার স্রোতে ব্যস্ত সন্তানকে মায়ের প্রতি তার চিরন্তন দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়াই এই দিবসের সার্থকতা। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রতি বছর সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অন্তত ২৮ হাজার মা মৃত্যুবরণ করেন। অপ্রাপ্ত বয়সে মাতৃত্ব বা অপুষ্টির মতো কারণে ঘটা এই মাতৃমৃত্যু রোধে জনসচেতনতা তৈরি করতে মা দিবস একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
মায়ের প্রতি অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা আর সীমাহীন শ্রদ্ধায় অবনত হওয়ার দিনই হলো মা দিবস। এই একটি দিন যেন সন্তানের চোখ খুলে দেয় মায়ের অবদানের প্রতি, স্মরণ করিয়ে দেয় তার ত্যাগের মহিমা। মায়ের সত্তা সন্তানের প্রতিটি রক্তকণায় মিশে আছে। তাই মা দিবস কেবল এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিদিনের সেই গভীর ভালোবাসারই একটি বার্ষিক নবায়ন।



