এলপিজির আগুনে দগ্ধ জনজীবন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু

আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে আবার বাড়ানো হয়েছে তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১,৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় মূল্যবৃদ্ধির নিষ্ঠুর শিকার হলেন দেশের সাধারণ ভোক্তারা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এই সিদ্ধান্ত গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধির অবিরাম ধারায় সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে আবার বাড়ানো হয়েছে তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১,৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় মূল্যবৃদ্ধির নিষ্ঠুর শিকার হলেন দেশের সাধারণ ভোক্তারা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এই সিদ্ধান্ত গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

খাদ্যপণ্য, পরিবহন ও বাসাভাড়ার ঊর্ধ্বগতির চাপে যখন নাভিশ্বাস উঠছে, তখন জ্বালানির এই নতুন ধাক্কা নি¤œ ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে করে তুলেছে চরম অসহনীয়। একইসাথে ফার্নেস অয়েল ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তৎপরতাও শুরু হয়েছে।

এক মাসেই দুই দফা মূল্যবৃদ্ধি : দিশেহারা ভোক্তা

চলতি মাসের শুরুতেই এলপিজির দাম প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। এর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার প্রতি কেজিতে আরো ১৭ টাকা ৬২ পয়সা বাড়ানো হলো। এক মাসের ব্যবধানে দুই দফা বৃদ্ধিতে গ্রাহকদের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ খসে পড়ছে। এখন একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে প্রায় দুই হাজার টাকা, যা অনেক নি¤œ আয়ের মানুষের মাসিক বাজেটের বাইরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির এমন ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনে আঘাত করে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে বাজারের প্রতিটি পণ্যের মূল্যের ওপর।

আয় স্থির, ব্যয় আকাশচুম্বী

বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ মানুষের আয় থমকে আছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির হার মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় নগণ্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ‘ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস’-এর একটি চরম উদাহরণ। শহরের যে বিশাল জনগোষ্ঠী সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জীবনে এই বাড়তি খরচ মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও এলপিজির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের ফলে সেখানেও রান্নার খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গেছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার অশনি সঙ্কেত

জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কেবল গ্যাসে সীমাবদ্ধ নেই। ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের লক্ষ্যে মন্ত্রিসভার একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, শিগগিরই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দামও বাড়ছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারের পণ্যমূল্য আবারো আকাশছোঁবে, যা একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’-এর মতো পুরো অর্থনীতিকে সঙ্কটে ফেলবে।

‘আন্তর্জাতিক বাজার’ কি স্রেফ অজুহাত?

বিইআরসি বারবার আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিলেও বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তাদের মতে, দেশীয় বাজারে মূল্য নির্ধারণে সরকারের নীতিগত ও করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া বাংলাদেশে এলপিজি বাজারে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য এবং প্রতিযোগিতার অভাব নিয়ে সমালোচনা দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগ নিয়ে অনেক কোম্পানি অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে।

বিকল্পহীন মানুষের হাহাকার

গ্যাসের দাম বাড়ায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে কাঠ বা কয়লার দিকে ঝুঁকছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। একজন নি¤œ আয়ের চাকরিজীবীর ভাষায়, “বাসাভাড়া আর বাজারের খরচ মিটিয়ে কিছুই থাকে না। এখন গ্যাসের পেছনে দুই হাজার টাকা চলে গেলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।”

উত্তরণের পথ ও নীতিগত সমাধান

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু আমদানিনির্ভর বাজারনীতির ওপর ভরসা না করে সরকারকে একটি স্থিতিশীল ‘ভোক্তাবান্ধব’ মূল্যনীতি গ্রহণ করতে হবে। কর হ্রাস বা প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ ছাড়া জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে আমদানি থেকে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের খরচ জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

বিদ্যমান বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলার সঙ্কট এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতার কারণে সামনে দিনগুলো আরো কঠিন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তবে এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। জনগণের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে সরকারের উচিত কেবল দাম বাড়ানো নয় বরং স্বস্তি ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই নীরব হাহাকার একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।