গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি
গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানায় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে নেয়া দুটি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা মিলেনি ঘটনার প্রায় ২০ দিন পরও। বৈষম্যবিরোধী জুলাই আন্দোলনে হামলার মামলায় আটক হওয়া আব্দুর রহিমকে পুলিশ ছেড়ে দিলেও, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও পুলিশকে হত্যার হুমকির ঘটনায় দায়ের হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় বিএনপির সক্রিয় কর্মী শহীদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। একই প্রেক্ষাপটে দুই ভিন্ন সিদ্ধান্ত ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার মামলায় লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৯ জুন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিমকে আটক করা হয়। পরে যাচাই করে দেখা যায়, তিনি ওই মামলায় আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। এ কারণেই তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে শুধু জুলাই আন্দোলনের মামলাই নয়, সম্প্রতি মালেকের বাড়ি এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল এবং ওই মিছিল থেকে পুলিশকে হত্যার হুমকির ঘটনায় দায়ের হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানোর সুযোগ ছিল। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তা করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, গাছা থানা বিএনপির সভাপতি মনিরুল ইসলাম বাবুলের হস্তক্ষেপের পরই তাকে আর কোনো মামলায় গ্রেফতার না দেখিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্য দিকে একই সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গত ২১ জুন রাতে গ্রেফতার হওয়া শহীদুল ইসলাম এখনো কারাগারে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিনের বিএনপি কর্মী হলেও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে তাকে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
শহীদুলের স্ত্রী সেলিনা বলেন, ‘২২ বছর ধরে সংসার করছি। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি আমার স্বামী বিএনপির রাজনীতি করে। গত সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা করেছে। আত্মীয়স্বজনদের নিজ খরচে ভোট দিতে এনেছে, আমাদের বাসায় রেখেছে। আজ সেই মানুষটিকেই আওয়ামী লীগ বানিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। আমার ছোট ছোট সন্তান প্রতিদিন বাবার জন্য কাঁদে। অথচ যাকে পুরো এলাকা আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে চেনে, তাকে পুলিশ আটক করেও ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে আবার আমার স্বামীকে নতুন মামলার হুমকি দিচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে ফারিয়া সেতু বলেন, ‘রাস্তার ড্রেন সরানো নিয়ে আমাদের সাথে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই বাবাকে আওয়ামী লীগ বানিয়ে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করানো হয়েছে।’
গাজীপুর মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম মোল্লাহ বলেন, ‘শহীদুল আমাদের দলের কর্মী। গত সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে সে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালিয়েছে। তাকে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ নেই।’
গাছা থানার ওসি মো: গোলাম রব্বানী বলেন, ‘লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আব্দুর রহিমকে আটক করা হয়েছিল। পরে তিনি আদালতের জামিনে রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। আর শহীদুলের বিষয়টি আমি অবগত নই। আমি এই থানায় যোগদানের আগে তিনি গ্রেফতার হন।’ তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের প্রশ্নের জবাব এখনো মেলেনি- জুলাই আন্দোলনের মামলায় জামিনে থাকলেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নতুন মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো না কেন? আবার একই মামলায় বিএনপি কর্মী শহীদুল ইসলামকে কেন কারাগারে পাঠানো হলো?
একই থানার একই সময়ের দু’টি সিদ্ধান্তের এই বৈপরীত্য এখনো গাজীপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত হলে এমন বৈষম্যের অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকত না। এখন অনেকেই জানতে চাইছেন, দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুই ধরনের সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ কী।



