- বাংলাদেশের সংস্কারকার্যক্রমে জাপানের পূর্ণ সমর্থন
- ছয়টি সমঝোতা স্মারক সই
জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতিগঠন, সংস্কার উদ্যোগ এবং শান্তিপূর্ণ উত্তরণের প্রচেষ্টায় তার দেশের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে উভয় পক্ষই দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এদিকে জাপান ও বাংলাদেশ একটি চুক্তিপত্র বিনিময় করেছে। এই চুক্তির অধীনে বাজেটসহায়তা, রেলপথ উন্নয়ন এবং অনুদান হিসেবে জাপান বাংলাদেশকে মোট ১ দশমিক ০৬৩ বিলিয়ন বা ১০৬ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে। গতকাল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের জাপান সফরের তৃতীয় দিনে এ বিষয়ে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়।
এই অর্থের মধ্যে ৪১৮ মিলিয়ন ডলার ডেভেলপমেন্ট পলিসি ঋণ হিসেবে দেবে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানান। এ ছাড়াও, ৬৪১ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রুটকে ডুয়েল-গেজ ডাবল রেললাইন হিসেবে উন্নীত করার জন্য এবং আরো ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে স্কলারশিপের জন্য।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জাপানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মো: দাউদ আলী এবং জাপানের পক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত শিনইচি সাইদা নিজ নিজ দেশের হয়ে এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।
সংস্কার কার্যক্রমে পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত
বাসস জানায়, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু গতকাল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতি গঠন, সংস্কার উদ্যোগ এবং বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের প্রচেষ্টায় তার দেশের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এ দিন সকালে টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সাথে এক বৈঠকে তিনি তার আশ্বাস ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে উভয় পক্ষই দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তারা সবার জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি) অঞ্চলের জন্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময়ের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
উভয় নেতা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করেন এবং জাতিসঙ্ঘের সনদের নীতিমালা সমুন্নত রেখে এই অঞ্চল এবং তার বাইরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে বহুপাক্ষিকতার প্রতি তাদের সমর্থনের আশ্বাসও দিয়েছেন।
জাপান-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও গভীরভাবে আলোচনা করেছেন।
জাপান-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে বিশেষ করে মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগসহ (এমআইডিআই) বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প বৃদ্ধি বেল্ট (বিআইজি-বি) উদ্যোগের আওতাধীন প্রকল্পগুলোর জন্য টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নে জাপান সরকারের অব্যাহত সহায়তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এ প্রসঙ্গে উভয় পক্ষ অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সহনশীলতা জোরদার করার জন্য উন্নয়ন নীতি ঋণের জন্য নোট বিনিময় স্বাক্ষর এবং জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী সেকশন (ও) এর মধ্যে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ঋণ স্বাক্ষরকে স্বাগত জানায়।
উভয় পক্ষ বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য বিডাতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) সিস্টেম, প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন, ব্যাটারিচালিত চক্রের জন্য কারখানা স্থাপন, তথ্য সুরক্ষার জন্য একটি পাইলট প্রকল্প চালু এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (বিএসইজেড) সাথে ভূমি চুক্তিসহ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানায়।
তারা পারস্পরিক লাভজনকভাবে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পন্ন করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন এবং তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয় এবং আলোচক দলগুলোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেন।
উভয় পক্ষই জাপানের অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্সের (ওএসএ) আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌকা দ্রুত সরবরাহসহ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তিতে দুই সরকার নীতিগতভাবে একমত হওয়ায় তারা স্বাগত জানিয়েছেন এবং চুক্তিটি দ্রুত সম্পন্ন করার আশা প্রকাশ করেছেন।
উভয় পক্ষ দক্ষ মানবসম্পদসহ জনগণের মধ্যে বিনিময় বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের বৃত্তিসহ বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের অব্যাহত সহায়তার জন্য অধ্যাপক ইউনূস ইশিজাপানের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দেয়ার এবং তাদের জন্য অব্যাহত মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন।
অধ্যাপক ইউনূস ভাসান চরসহ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের জন্য জাপানের মানবিক সহায়তার প্রশংসা করেছেন।
এই বিষয়ে জাপান তার টেকসই প্রচেষ্টা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
উভয় পক্ষই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের মিয়ানমারে একটি টেকসই, নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন হলো এই সঙ্কটের চূড়ান্ত সমাধান।
উভয় পক্ষই সঙ্কটের সমাধানের জন্য সব সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের মধ্যে আন্তরিক সংলাপের গুরুত্ব স্বীকার করেছে।
অধ্যাপক ইউনূস তাকে এবং তার প্রতিনিধিদলের প্রতি উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য ইশিবা শিগেরু এবং জাপানের জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী লামিয়া মোরশেদ এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
নতুন বাংলাদেশ গড়তে জাপানের সর্বাত্মক সহায়তা কামনা
বাসস : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জাপানের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন।
গতকাল টোকিওর জেট্রো সদর দফতরে আয়োজিত সেমিনারে তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছি আপনাদের ধন্যবাদ জানাতে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে। জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাইকা যৌথভাবে বাংলাদেশ বিজনেস সেমিনারের আয়োজন করে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা বড় বিপদের মধ্যে আছি। আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশ ১৬ বছরের একটি ভূমিকম্প পার করেছে। সবকিছু ভেঙে পড়েছে। আমরা এখন টুকরো টুকরো করে গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করছি।’
জাপানকে বাংলাদেশের বন্ধু আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, একজন ভালো বন্ধু কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ায় এবং জাপান সেই বন্ধু। তিনি আরো বলেন, আমাদের কাজ হলো অসম্ভবকে সম্ভব করা এবং আপনি আমাদের সঙ্গী ও বন্ধু। এটি বাস্তবে রূপ দিন।
নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা একটি ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, আমরা ইতিহাসকে দেখাতে চাই যে, এটি সম্ভব হয়েছে, তা-ও নিখুঁতভাবে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অন্য একটি বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করুন, যাকে আমরা নতুন বাংলাদেশ বলি। তাই আমাদের কাজ হচ্ছে একসাথে সেই নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি করা।
তিনি বলেন, আপনাদের সহযোগিতায় এটি বাস্তবায়নযোগ্য এবং আমরা ইতোমধ্যে তার ভিত্তি স্থাপন করেছি।
মাতারবাড়ি উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, এটি পিছিয়ে থাকা একটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। এটি কেবল অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবন বদলে দেয়ার ব্যাপার।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ আরো বহু মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের জন্য দরজার মতো যেমন- নেপাল, ভুটান এবং ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যের মানুষ সমুদ্রের পথ পেতে পারে বাংলাদেশ হয়ে।
তিনি বলেন, মাতারবাড়ি হচ্ছে বাকি বিশ্বের জন্য দরজা। আমরা তাদের জন্য এই দরজা খোলা রাখব।
জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক পার্লামেন্টারি ভাইস মিনিস্টার তাকেউচি শিনজি বলেন, বাংলাদেশ হলো একটি কৌশলগত বিন্দু যা এশিয়াকে সংযুক্ত করে এবং এই অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে জাপান দেশটির উন্নয়নে সহায়তা করে আসছে। তিনি আরো বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় জাপান সরকার।
জাপানি সরকার দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে, জাপানি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে বলেও জানান তাকেউচি ।
ড. ইউনূস বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করে টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশের সাথে জাপানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য মূলত টেক্সটাইল শিল্পভিত্তিক উল্লেখ করে তিনি আরো বিস্তৃত খাতে বিনিয়োগ বৈচিত্র্য আনার আহ্বান জানান।
সভায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, প্রধান উপদেষ্টার এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং টোকিওস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো: দাউদ আলী উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ-জাপান ৬টি সমঝোতা স্মারক সই
বাসস জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরের তৃতীয় দিনে গতকাল বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সহযোগিতাসংক্রান্ত ছয়টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।
টোকিওতে ‘বাংলাদেশ বিজনেস সেমিনার’ শীর্ষক একটি সেমিনারের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের উপস্থিতিতে এই সমঝোতা স্মারকগুলো সই হয়। প্রথম সমঝোতা স্মারকটি ছিল জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং বাংলাদেশের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে। এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে জেবিআইসি জ্বালানি খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরো জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় সমঝোতা স্মারকটি ছিল অনোডা ইনক ও বাংলাদেশ এসইজেড লিমিটেডের (বিএসইজেড) মধ্যে, এর আওতায় অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি জমি লিজ-সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে। অনোডা ইতোমধ্যে জাইকার উদ্যোগে একটি গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং এখন সেখানে গ্যাস মিটারের অ্যাসেম্বলি, ইন্সপেকশন ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে।
তৃতীয় সমঝোতা স্মারকটি ছিল বাংলাদেশ নেক্সিস কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশ এসইজেড লিমিটেডের মধ্যে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি লিজ-সংক্রান্ত। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ নেক্সিস কোম্পানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি কারখানায় গার্মেন্ট এক্সেসরিজ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে।
চতুর্থ সমঝোতা স্মারকে গ্লাগিট, মুসাসি সিমিতিসু ইন্ডাস্ট্রি গ্লাফিট এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মধ্যে ব্যাটারি চালিত বাইসাইকেল ও বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল তৈরির একটি কারখানা স্থাপনবিষয়ক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চম সমঝোতা স্মারকটি কিপার কোর কোম্পানি লিমিটেডের সাথে, যারা বাংলাদেশে দুই কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে তথ্য নিরাপত্তায় তাকাতোসি নাকামোরা পুরস্কারপ্রাপ্ত পূর্ণাঙ্গ কিপার প্রযুক্তির ভিত্তিতে একটি জাতীয় পাইলট প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তর করা।
প্রযুক্তির প্রয়োগ ও বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণের একচেটিয়া অধিকার স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়েছে।
ষষ্ঠ সমঝোতা স্মারকটি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও বিডার মধ্যে।
এই চুক্তির মাধ্যমে জাইকা একীভূত সিঙ্গেল উইন্ডো প্ল্যাটফর্মের (আইএসডব্লিউপি) প্রাথমিক উন্নয়নে কারিগরি ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করবে। এই প্ল্যাটফর্মটি বিডার নেতৃত্বে গঠিত, যার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার সেবাকে এক-দরজায় একত্রিত করা।
স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এমওইউ স্বাক্ষরকারী সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের কাজ এর বাস্তবায়ন করা। আমি অভিভূত।’
গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই সময়ে দেশটিতে একের পর এক ভূমিকম্প হয়েছে, যার ফলে কিছুই অক্ষত ছিল না।’
এই চ্যালেঞ্জকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ইতিহাসকে দেখাতে চাই যে, এটি সম্ভব হয়েছে, তা-ও নিখুঁতভাবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের বেল্ট শক্ত করে ধরে বলেছি, আমরা কাজ করতে প্রস্তুত। আপনাদের সহায়তায় এটা সম্ভব।’
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘চলুন হাতে হাত মিলিয়ে বাস্তবায়ন করি। এটা শুধু অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়। এটা মানুষের জীবন পরিবর্তনের বিষয়।’
জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় ভাইস মিনিস্টার শিনজি তাকেউচি অনুষ্ঠানে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মরত জাপানি কোম্পানির সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে, যা ১০ বছর আগের চেয়ে তিন-চতুর্থাংশ বেশি।
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) চেয়ারম্যান ও সিইও নোরিহিকো ইশিগুরো অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন, যেখানে জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) চেয়ারম্যান ও মারুবেনি করপোরেশনের বোর্ড সদস্য ফুমিয়া কোকুবু-ও বক্তব্য রাখেন।
পৃথিবীকে রক্ষায় তরুণদের ‘থ্রি জিরো ক্লাব’ গড়ে তোলার আহ্বান
বর্তমান সভ্যতার ধারায় পৃথিবী টিকে থাকতে পারবে না উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে তরুণদের ‘থ্রি জিরো ক্লাব’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি গতকাল টোকিওর সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাকালে বলেন, ‘আমরা যে সভ্যতা তৈরি করছি, তা একটি আত্মবিধ্বংসী সভ্যতা, যা পৃথিবীকে ধ্বংস করবে।’
ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান সভ্যতার কাঠামোর মধ্যে মানুষ টিকে থাকতে পারবে না, কারণ বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ধ্বংস অব্যাহত আছে।
তিনি তার ‘থ্রি জিরো থিওরি’ বা তিন শূন্য তত্ত্ব- শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণের কথা উল্লেখ করে বলেন, এখন সবাই কেবল তাদের মুনাফা সর্বাধিক করতে চাচ্ছে।
বিশ্বের সম্পদের বেশির ভাগ এখন খুব অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত, যাকে তিনি এক অভিশাপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক ইউনূস বেকারত্বের সমস্যা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আগত চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেও আলোকপাত করেন।
‘থ্রি জিরো ক্লাব’ সম্পর্কে তিনি বলেন, পাঁচজন ব্যক্তি একত্রিত হয়ে একটি থ্রি জিরো ক্লাব গঠন করতে পারে, যেখানে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকবে যে তারা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করবে না।
তরুণ প্রজন্মকে নতুন এক বিশ্ব গড়তে সৃজনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই নোবেল জয়ী অধ্যাপক ইউনূস বলেন, চাকরি মানুষের সৃজনশীলতাকে দমন করে।
মানুষের সহজাত উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘যদি তোমার মধ্যে সৃজনশীলতা না থাকে, তবে তুমি কিছুই নও...প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সৃজনশীলতা আছে।’
তিনি উদ্যোক্তা তৈরি করতে সামাজিক ব্যবসায় ক্লাব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘একটি নতুন পৃথিবী কল্পনা করো, কারণ কল্পনা তোমাকে নিজেকে উন্মুক্ত করার ক্ষমতা দেয়।’
ড. ইউনূস অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের জানান কিভাবে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক থাকাকালে পাশের একটি ছোট গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের যাত্রা শুরু করেন।
অনুষ্ঠানে সোকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
বিশ্বব্যাপী সামাজিক উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক উন্নয়নের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট সুজুকিও বক্তব্য রাখেন।



