নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ। চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, আলু, ডিম, মুরগি ও সবজিসহ প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম, ডলার সঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল, গম ও চিনির দামের ওঠানামা দেশের খুচরা বাজারে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক কারণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং বাজার তদারকির ঘাটতিও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকটি পণ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সাধারণ পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতায় চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজার পর্যবেক্ষণ ও সরকারি সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চাল, পেঁয়াজ, ডিম, সবজি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মিনিকেট ও ব্র্যান্ডেড চালের দাম স্থিতিশীল হলেও মোটা চালের দাম এখনও বেশি। ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দামও ওঠানামা করছে। বোতলজাত তেলের দাম সরকারি নির্ধারিত দামের কাছাকাছি থাকলেও খোলা তেলের দাম বেশি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। পেঁয়াজ ও আলুর মতো কৃষিপণ্য মৌসুমভেদে দামের বড় ব্যবধান তৈরি করছে। কাওরানবাজারের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, পাইকারি বাজারে দাম একটু বাড়লেই খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ে। আবার দাম কমলেও পাইকারি পর্যায়ে তাৎক্ষণিক সমন্বয় হয় না। ফলে খুচরা বিক্রেতারা চাপে পড়েন।
সরকারের পরিসংখ্যান সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
রাজধানীর কাওরানবাজার, খিলগাঁও ও মিরপুরের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক মাসে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দামে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খেসারি ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি, যা এক মাস আগে ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। মসুর ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি। ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১৫ টাকা কেজি, যা রমজানে ইফতার সামগ্রীর প্রধান উপাদান।
ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা। পাম তেল ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকা লিটার। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়ছে।
পেঁয়াজ ও রসুনের দামও বেড়েছে। দেশী পেঁয়াজ কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, যা আগে ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৭০ টাকার ঘরে। দেশী রসুন ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি, আমদানি করা রসুন ১৪০ টাকার বেশি। আদা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি।
রমজানকেন্দ্রিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য খেজুর। নি¤œমানের খেজুর ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি, মাঝারি মানের খেজুর ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি ব্যয় ও ডলারের উচ্চমূল্যের প্রভাব দামে পড়েছে। মুরগির বাজারেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা, সোনালি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। গরুর গোশত ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি, যা গত মাসের তুলনায় কিছুটা বেশি। চাল বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি দাম দেখা গেছে। মাঝারি মানের মিনিকেট চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি, যা এক মাস আগে ছিল ৫৮ থেকে ৬০ টাকা। মোটা চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মিরপুরের এক গৃহিণী অভিযোগ করেন, সরকার বলে দাম কমেছে, কিন্তু বাজারে গেলে তা বোঝা যায় না। মাসে বাজার খরচ কমপক্ষে তিন-চার হাজার টাকা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের কৌশল নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি বাড়ানো, ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি মজুদদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সুবিধা উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল আধুনিকীকরণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকার ইতোমধ্যে চাল ও গম আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। এ ছাড়া রমজানকে সামনে রেখে চিনি, ডাল ও তেলের মজুদ বাড়ানো হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী মহল বলছে, এলসি খোলার জটিলতা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সঙ্কট এবং ডলার বিনিময় হারের অস্থিরতা আমদানিতে প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। আলু, পেঁয়াজ বা ডিম উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মৌসুম শেষে দাম বেড়ে যায়। কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা সীমিত হওয়ায় কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হয়। নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা। নির্বাচনী প্রচারণায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ফলে জনগণ দ্রুত ফল দেখতে চায়। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমানো একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, আমদানি নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া তা সম্ভব নয়।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে নয়, অভ্যন্তরীণ বাজার কাঠামোর দুর্বলতার কারণেও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, পর্যাপ্ত বাজার তদারকির অভাব এবং নীতির অসামঞ্জস্যতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে।’ তিনি মনে করেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে দামের স্থিতিশীলতা আসবে না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন উচ্চপর্যায়ে থাকলে নি¤œ আয়ের মানুষের বাস্তব আয় কমে যায়। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় হয়। ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দেয়। তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং টার্গেটেড ভর্তুকির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তার ভাষায়, ডলার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনতে হবে। কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, সরবরাহপক্ষেও কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, সংরক্ষণ সুবিধা ও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তুললে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দামের ব্যবধান কমবে। এ ছাড়া বাজারে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও তা অনেক সময় সাময়িক প্রভাব ফেলে। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা, যেখানে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত দামের তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে। এতে কারসাজি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক- দুই দিক থেকেই বাজার নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা জন-অসন্তোষ বাড়াতে পারে। আবার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। তাই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদন ব্যয় কমাতে ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল হবে। একই সাথে মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ নতুন সরকারের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। জনগণ দ্রুত স্বস্তি চায়, ব্যবসায়ীরা চায় নীতি স্থিতিশীলতা, আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপের কথা। কার্যকর পরিকল্পনা ও দৃঢ় বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।



