সরকার ও বিরোধীদলে উত্তেজনা সৃষ্টিতে কাজ করছে তৃতীয় পক্ষ

সামাজিক মাধ্যমে ‘ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা’র নেপথ্যে কারা

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি চক্র সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তারকা, শিল্পপতি, আমলাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে-বেনামে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা পরিস্থিতি তৈরি করছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে কখনো কখনো সঙ্ঘাতে রূপ নিচ্ছে। সচেতন মহলে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- প্রকৃতপক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর নেপথ্যে কে বা কারা কাজ করছে কিংবা কাদের ইন্ধনে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ঘায়েল করা হচ্ছে?

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি চক্র সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তারকা, শিল্পপতি, আমলাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে-বেনামে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা পরিস্থিতি তৈরি করছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে কখনো কখনো সঙ্ঘাতে রূপ নিচ্ছে। সচেতন মহলে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- প্রকৃতপক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর নেপথ্যে কে বা কারা কাজ করছে কিংবা কাদের ইন্ধনে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ঘায়েল করা হচ্ছে? এমনও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- এসব প্রোপাগান্ডায় পলিটিক্যাল অনলাইন এক্টিভিস্টদের ব্যবহার করা হচ্ছে নাকি ভিউ ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে? তবে অপতথ্য ছড়িয়ে তৃতীয় একটি পক্ষ সুবিধা নেয়ার নিমিত্তে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তেজনা তৈরিতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য সংগ্রহ করছে অসাধু চক্রগুলো। এসব তথ্য দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কখনো কখনো অর্থও দাবি করা হচ্ছে। ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পরিবার এবং শীর্ষ নেতাদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করেও বানানো হচ্ছে ভুয়া ফটোকার্ড। ছড়ানো হচ্ছে বিকৃত ভিডিও, মিথ্যা তথ্য। মানুষের গোপনীয়তাকে বানিয়ে তোলা হচ্ছে পণ্য। এগুলো কেবল অপরাধ নয়, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগেরও কারণ বটে।

আসুন আমরা একটু জেনে নিই আসলে প্রোপাগান্ডা কী: প্রোপাগান্ডা মূলত তথ্যকে ব্যবহার করে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল, যা কখনো ইতিবাচক বা কখনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যভাবে বললে, এটি একটি বিশেষ উদ্দেশ্য বা অবস্থানের দিকে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আচরণ চালিত করার জন্য সম্প্রচারিত এমন কিছু নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ মাধ্যম, যেগুলো সেই উদ্দেশ্য বা অবস্থানের সব দিক উল্লেখ না করে কেবলমাত্র একটি দিককে প্রাধান্য দেয়। প্রোপাগান্ডায় কখনো কখনো আংশিক সত্য বা আংশিক মিথ্যাকে প্রচার করা হয়। জনগণের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির কাক্সিক্ষত পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত প্রোপাগান্ডার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয় এবং সব ধরনের প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। তবে আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আদর্শগত বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের একটি বড় হাতিয়ার হচ্ছে এই প্রোপাগান্ডা, যা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ঘায়েল করতে বেছে নেয়া হচ্ছে।

প্রোপাগান্ডার মাধ্যম : এটি নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ না করে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ একটি নির্বাচিত দিকে ধাবিত করতে সহায়তা করে। প্রোপাগান্ডা এমন কিছু নির্বাচিত ঘটনা বা তথ্য তুলে ধরে যাতে কোনো একটি বিষয় সম্পর্কে দর্শক কেবলমাত্র একটি উপসংহারে উপনীত হতে বাধ্য হয়। এসব তথ্য বা ঘটনা জনমনে আবেগের সঞ্চার করে এবং যুক্তিগ্রাহ্য চিন্তাভাবনা করতে বাধা দেয়। এ ক্ষেত্রে প্রোপাগান্ডা বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে- বক্তৃতা, প্রচারপত্র, পোস্টার, সংবাদপত্রে বিবৃতি, চলচ্চিত্র, ব্যক্তিগত ক্যানভাসিং, সংবাদ সম্মেলন, রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার, সেমিনার, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, অনলাইন রেডিও, ব্লগ, খুদে বার্তা ইত্যাদি। তবে বর্তমান আধুনিক বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রোপাগান্ডার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা কারা ছড়াচ্ছে : বিশেষজ্ঞরা বলছেন- প্রথমত, রাজনৈতিক দল ও কর্মীরা তাদের নিজ দলের পক্ষে জনমত তৈরি এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করতে প্রায়ই ‘বট অ্যাকাউন্ট’ বা ফেক আইডি ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক ও গোয়েন্দা সংস্থা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল বা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ও ডিপফেক ভিডিও ছড়ানো হয়ে থাকে। তৃতীয়ত, চরমপন্থী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো মতাদর্শ প্রচার এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য ইন্টারনেটে বিশাল গোপন লাইব্রেরি ও প্রচার চালিয়ে থাকে। চতুর্থত, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য হাসিল বা গুজব ছড়িয়ে ফায়দা লুটতে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল ও অসাধু চক্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। এ ক্ষেত্রে পতিত ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক কর্মীরা সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির নিমিত্তে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে- কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি-বেসরকারি ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোও সেই তথ্যের নিশ্চয়তা দিচ্ছে। ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার ধরন: ডিপফেক ভিডিও: এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বাস্তবধর্মী ভুয়া ভিডিও। বট নেটওয়ার্ক : হাজার হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে একই তথ্য বারবার শেয়ার করা। বিকৃত তথ্য: সত্যের সাথে মিথ্যা মিশিয়ে বা তথ্য আংশিক উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি। বাংলাদেশেও রাজনীতির মাঠে এ আই প্রোপাগান্ডা এবং অনলাইন রাজনীতিতে ফেক অ্যাকাউন্টের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাইবার নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মত

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ফজলুল করিম পাটোয়ারী নয়া দিগন্তকে বলেন, আধুনিক মারণাস্ত্র হলো ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা। এর মাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় নিরাপত্তাকে স্থায়ীভাবে হুমকিতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। যারা এগুলো করছে তারা নিজেদের আইডির রিচ বাড়ানো, অধিক ভিউয়ের আশা, ফ্যান ফলোয়ার বাড়ানো, লাইক কমেন্ট পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে ভুয়া তথ্য মিশিয়ে ফটোকার্ড তৈরি করে বা কনটেন্ট ক্রিয়েট করে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এগুলো দুই ধরনের মানুষ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য করে থাকে। প্রথমত, সাধারণ কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। এরা তেমন ক্ষতিকর নয়। দ্বিতীয়ত’ রাজনৈতিক ভিউ ব্যবসায়ীরা। তারা সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাদের মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যকে হেয়প্রতিপন্ন করে, রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছড়ায় এবং কখনো কখনো সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সবই করে থাকে পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অধিক ভিউয়ের আশায় বড় বড় গণমাধ্যমও আংশিক সত্য দিয়ে সংবাদের শিরোনাম করছে, যা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্য বা অপতথ্য ছড়ানোর কারণে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চরম উত্তেজনাও তৈরি হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ফজলুল করিম বলেন, এটার প্রতিরোধ করার জন্য আসলে তেমন কোনো কার্যকরী উপায় নেই। অসংখ্য বট আইডি বাজারে রয়েছে এগুলো প্রতিদিন এত বেশি পোস্ট করে যা প্রতিরোধ করার মতো সরকারের যথেষ্ট সাইবার নিরাপত্তা নিই। ওই বট আইডিগুলো শনাক্ত করার জন্য যে পরিমাণে বিনিয়োগ দরকার সেটাও পর্যাপ্ত না। তা ছাড়া যারা এগুলো শনাক্ত করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেবে পোস্টগুলো যদি তাদের পক্ষে যায় তা হলে কেন তারা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেবে? এ জন্য অপতথ্যগুলো সরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা পর্যাপ্ত ইনভেস্টও করবে না। তবে রাজনীতির মাঠে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ঠেকাতে সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগী হলে কিছুটা সুফল পাওয়া যাবে। নিজ নিজ দলের কর্মীদের ডিজিটাল আচরণে দায়বদ্ধ করা গেলে হয়তো একটি প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে।