এস কে থ্রি জিরো থ্রি

Printed Edition
এস কে থ্রি জিরো থ্রি
এস কে থ্রি জিরো থ্রি

মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী

চারদিকে হই হই রই রই। খুনাতঙ্ক। সমাজের এলিট শ্রেণীতে বেছে বেছে খুন হচ্ছে। কে খুন করছে, কেন করছে- কিছুই জানা যাচ্ছে না। দেশের বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা দিশেহারা। খুনের কোনো আলামত পাওয়া যায় না। এত নিখুঁত কাজ! এতদিন পুলিশ বলেছে- অপরাধী তার কাজের মধ্যে প্রমাণ রেখে যায়। তার জড়িত থাকার প্রমাণ। কিন্তু এই ধারাবাহিক খুনে কোনো ক্লু পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ফাঁকি দিচ্ছে। কে এই সিরিয়াল কিলার? কেনইবা তার এই নৃশংসতা! কিছুই জানা যাচ্ছে না। বিষয়টি সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠক ডেকেছে। খুনিকে ধরার জোরালো তাগিদ দিয়েছে। পুরস্কার ঘোষণা করেছে। কিছুতেই কোনো কাজ হচ্ছে না। একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। নগরে নগরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সর্বশেষ খুন হয়েছেন,শহরের বিশিষ্ট শিল্পপতি জোয়ার্দার এম রহমান। তার পোষা কুকুর ব্ল্যাক রোভারও খুন হয়েছে। তার সাত বছর বয়সী নাতনি মিথিলাও খুন হয়েছে। মিথিলা তার দাদুর খুব ভক্ত ছিল। বিষয়টি খুবই রহস্যজনক। এই কুকুরটিও তার খুব প্রিয় ছিল। বাসার দেয়ালে ব্ল্যাক রোভারের সাথে তার আর মিথিলার একটি ছবি টানানো আছে। এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন আব্দুল্লাহ আরহাম। তিনি পিবিআইয়ের চৌকশ কর্মকর্তা। এই বিভাগে তিনি কাজ করছেন প্রায় ১২ বছর ধরে। অনেক জটিল রহস্যের উদঘাটন করেছেন তিনি। সব সময় তার মাথায় গোয়েন্দা চিন্তা-ভাবনা খেলা করে। তাকে বলা হয় ২৪ ঘণ্টার গোয়েন্দা। তিনি এলেন। শোকে স্তব্ধ পুরো বাসা। মিথিলার মায়ের চোখে নোনা জলের কবিতা। এই কবিতা সবাই পড়তে পারে না। যে পারে সে বুঝে এর পরতে পরতে কত কষ্ট লুকিয়ে আছে। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট নিলেন। মর্গে নিয়ে ময়নাতদন্ত করা হলো। ভিসেরা করা হলো। জোয়ার্দার সাহেবের মোবাইলের কললিস্ট চেক করা হলো। যাদের সন্দেহ করা হলো- তাদের জিজ্ঞাসা করা হলো। তাদের নিয়মানুযায়ী যা যা করার সব করছেন। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এতদিনের অভিজ্ঞতা কোনো কাজে আসছে না। অপরাধীরা অনেক চালাক। প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের ধরা এত সহজ কাজ না। পুরাতন গোয়েন্দাবিদ্যা আর কাজ করছে না।

শরতের ভ্যাপসা গরম। ঘরে টেকা দায়। বারোমেসে গরম। যে জিনিস রক্ষার দায়িত্ব সবার। সে জিনিস রক্ষার দায়িত্ব কারো না। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে। সবাই বলছে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু কেউ নিচ্ছে না। আরহাম সাহেব আকাশের দিকে তাকালেন। মেঘের ঘোমটা তুলে আড়চোখে তাকায় লাজুক চাঁদ। মায়া নদের পাড়ে, গাঢ় সবুজ দূর্বাঘাসে দুধসাদা চাদর বিছিয়ে শুয়ে আছে মায়াবী জোছনা। আরহাম সাহেবেরও ইচ্ছে করছে জোছনার বিছানায় শুয়ে আকাশ দেখতে। থেমে থেমে নদের পানিছোঁয়া মিহি বাতাস গা জুড়িয়ে দিচ্ছে। মাথায় একটা চিন্তা ঘুরপাক খায়। অস্থিরতার ঢেউ তোলে। কে সেই খুনি? কোথায় তার আবাস? বাতাসে ঢেউ তুলে উড়ে গেল নিশাচর বাদুড়। আলখাল্লা পরা এক ছিপছিপে তরুণ তুর্কি নদীরপাড় ধরে হেঁটে যায়। হনহন করে হাঁটছে। কোনো দিকে তাকায় না। আরহাম সাহেব কান খাড়া করেন। গলা খাঁকারি দেন। তরুণ তার দিকে তাকায়। আবার হাঁটতে থাকে। আরহামের সন্দেহ হয়। কী করবে ভাবতে ভাবতেই তরুণ অনেক দূরে চলে যায়। আরহাম তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। দেখতে দেখতে একটা ছায়ার মতো হয়ে যায়। আরহাম সাহেব অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরান। এই ভাবনা থেকে বের হতে চান। আবার আকাশের দিকে তাকান। মনে হয় চাঁদ গালভরে একটা হাসি দিয়েছে। খুশি খুশি ভাব। তার চারদিকে খুশির ঢল। চাঁদের খুশি আরহামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। ভাবের রাজ্যে পঙ্খিরাজ ঘোড়া নিয়ে ছুটতে থাকে। তার মনে হয় চাঁদ চিরযৌবনবতী। তার কখনো বয়স বাড়ে না।

হঠাৎ একটা আর্তনাদ ভেসে আসে। যান্ত্রিক কণ্ঠে সেভ মি সেভ মি বলে কে যেন চিৎকার করছে। আরহামের সম্বিত ফেরে। নদীতে জেলেরা মাছ ধরছে। তারা ছুটে এলো। একজন লোক চোরাবালিতে পড়ে চিৎকার করছে। এখানকার চোরাবালি গোপন ফাঁদের মতো। দেখে মনে হয় শক্ত মাটি। পড়ার পর বোঝা যায়- এটি চোরাবালি। তবে চোরাবালিগুলো অগভীর। বড়জোর বুক পর্যন্ত দেবে যায়। একজন একটা লগি তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। লোকটা খাঁমচা দিয়ে লগি ধরল। মাঝিরা ভয় পেয়ে গেল। মানুষের মতো হলেও মানুষ না। কয়েকজন হওয়াতে তারা সাহস হারাল না। লগির আরেক মাথা ধরে টান দিলো। টান দিতেই লোকটা নিথর হয়ে গেল। লগিটা হাত থেকে ফসকে গেল। মনে হয় মারা গেছে। তারা দূর থেকে চাদর পেঁচিয়ে কোনো রকমে টেনে তুলল। তারা বিস্মিত হয়ে গেল। এটি তো মানুষ না। মেশিন। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল- মেশিন ধরা পড়ছে। এমন সময় আরহাম সাহেব সেখানে হাজির হলেন। নিজের পরিচয় দিলেন। থানায় খবর দিয়ে ফোর্স নিয়ে আসলেন। তারা বুঝে গেল- এটি একটি অত্যাধুনিক রোবট। তার আলখাল্লার পকেটে একটি সেমি অটোমিক পিস্তল। সব খুনের সাথে এই পিস্তলের মিল পাওয়া যায়। তাহলে কি এ-ই সিরিয়াল কিলার! প্রযুক্তিবিদ আনা হলো। তিনি অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, এটি অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত রোবট। তার মেমোরিতে খুন হওয়া লোকদের ছবিসহ যাবতীয় তথ্য পাওয়া গেছে। যাদের ছবিসহ তথ্য এর কিলিং মিশনে আপলোড দেয়া হয়- তাদের সে নিখুঁতভাবে খুন করে। চোরাবালিতে পড়ে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। আরহাম সাহেব বুঝতে পারলেন, কেন জোয়ার্দার এম রহমানকে খুন করার সময় তার নাতনি ও কুকুরকেও খুন করেছিল। তার সাথে তাদের ছবিটাই কাল হয়েছিল।