বহুমুখী চাপে রয়েছে দেশের শিল্প খাত। জ্বালানি সঙ্কট, নীতিগত অনিশ্চয়তা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও দক্ষ শ্রমশক্তির ঘাটতির মতো একাধিক চাপে শিল্প খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে একদিকে যেমন রফতানি আদেশ সময়মতো পূরণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্য দিকে উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপও বাড়ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতির অভাব বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। কর ও শুল্ক নীতির ঘনঘন পরিবর্তন, উচ্চ সুদের হার এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, ফলে অনেক উদ্যোক্তা সেবা ও বাণিজ্য খাতে ঝুঁকছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প খাতের এই দুরবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ শিল্প খাতই মূলত ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মূল্য সংযোজনের প্রধান মাধ্যম। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে দ্রুত এই সঙ্কট মোকাবেলা না করলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের উৎপাদন ও রফতানিনির্ভর শিল্প খাত বর্তমানে একাধিক সঙ্কটের মুখোমুখি। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাসসঙ্কটে একদিকে যেখানে কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সাথে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক শুমারি ও শ্রমবাজারের তথ্য বলছে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। উৎপাদন হ্রাস, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা এবং আগাম শিল্পহীনতার আশঙ্কা সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি হচ্ছে একটি গভীর কাঠামোগত সঙ্কট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রফতানিমুখী শিল্প বিশেষ করে টেক্সটাইল, সিরামিক এবং তৈরী পোশাক খাতের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য ন্যূনতম ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক এলাকায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও ময়মনসিংহের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের এই সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, গ্যাসের অভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ছেন অনেক উদ্যোক্তা। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেয়ায় শিল্প খাত চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। পেট্রোবাংলা বা সংশ্লিষ্ট কোনো দফতর থেকে তাদের এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
তৈরী পোশাক খাতেও গ্যাসসঙ্কটের প্রভাব স্পষ্ট। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গ্যাসসঙ্কটে তাদের উৎপাদন প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। শুধু উৎপাদন কমাই নয়, অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহের কারণে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হচ্ছে, বাড়ছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ ও বিটিটিএলএমইএ- এই চার শীর্ষ শিল্প সংগঠন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে যৌথ চিঠি পাঠিয়ে গ্যাসসঙ্কটের কারণে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ৫০-৬০ শতাংশ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে। সঙ্কটের ফলে কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদন শৃঙ্খল ও সময়মতো রফতানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারির তথ্যে দেখা যায়, দেশে মোট এক কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে উৎপাদন খাতের অংশ মাত্র ৮.৭৭ শতাংশ। যেখানে ২০১৩ সালে এই হার ছিল ১১.৫৪ শতাংশ এবং ২০০৩ সালে ছিল ১২.১৪ শতাংশ।
অন্য দিকে, সেবা খাতের ইউনিট এখন মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯১.২৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি অস্বাভাবিক প্রবণতা। জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা জার্মানির মতো দেশগুলো শক্তিশালী শিল্পায়নের পর সেবা খাতে রূপান্তর ঘটিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ শিল্পায়নপর্ব সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সেবা খাতে ঝুঁকে পড়ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সেবা খাতের এই প্রবৃদ্ধি টেকসই নয়, কারণ এটি মূলত উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। বছরে ২০ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, তাদের জন্য এই খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে না। আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে শিল্প খাতের কর্মসংস্থান পরিসংখ্যানে। শিল্প উৎপাদন ও জিডিপিতে শিল্পের অবদান বাড়লেও কর্মসংস্থান প্রায় স্থবির। ২০১৩ সালে যেখানে কারখানাভিত্তিক কর্মসংস্থান ছিল এক কোটি ২১ লাখ, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ২০ লাখে।
অর্থনীতিবিদরা একে বলছেন ‘জবলেস গ্রোথ’। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, শিল্পের আউটপুট বাড়ছে, কিন্তু চাকরি কমছে, এটি কাঠামোগত রূপান্তরের বিপরীত চিত্র। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কাজী এস মুর্শিদ বলেন, আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর বড় শিল্পকারখানা উৎপাদন বাড়ালেও শ্রমের চাহিদা কমাচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষ শ্রমিকের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প খাতের এই দুরবস্থার পেছনে রয়েছে অবকাঠামো ঘাটতি, জ্বালানি সঙ্কট, অস্থির রাজস্ব নীতি ও উচ্চ সুদের হার। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক এক সভাপতি বলেন, উচ্চ জমির দাম, শিল্প প্লটের স্বল্পতা এবং গ্যাসসংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রতা উৎপাদনমুখী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশ কৃষি থেকে সরাসরি সেবা খাতে চলে যাচ্ছে, শিল্প খাতকে পাশ কাটিয়ে। তিনি আয়কর, ভ্যাট, শুল্ক ও মুদ্রানীতিতে দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জানান।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শক্তিশালী ও কর্মসংস্থানমুখী শিল্প খাত ছাড়া বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, শিল্পবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন ধস, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির এই চক্র বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো গভীর সঙ্কটে ঠেলে দিতে পারে এমনটাও আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।



