নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। জলাবদ্ধতা, সড়কে যানজট এবং বিভিন্ন জেলায় কৃষিজমি ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবজি, মাছ, কাঁচামরিচ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। ফলে নতুন করে চাপে পড়েছেন নি¤œ ও মধ্যবিত্ত আয়ের ভোক্তারা।
রাজধানীর মিরপুর-৬, দুয়ারিপাড়া কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে অনেক দোকান আংশিক খোলা থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। তবে সরবরাহ কমে যাওয়ার অজুহাতে অধিকাংশ সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। কয়েক দিন আগেও যেখানে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ৯০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, সেখানে এখন বাজারভেদে ১৪০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম গুনতে হচ্ছে।
গতকাল বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, করলা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পটোল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ও ঝিঙা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, লাউ ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং টমেটো ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে। ফুলকপি ও বাঁধাকপিও মৌসুমের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দেশী ধনেপাতা প্রতি কেজি ২৫০ টাকা এবং হাইব্রিড ধনেপাতা ১৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উত্তরাঞ্চল, যশোর, কুমিল্লা, নরসিংদী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন উৎপাদন এলাকা থেকে সবজিবাহী ট্রাক সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারছে না। কোথাও কোথাও ক্ষেতে পানি জমে সবজি নষ্ট হচ্ছে। ফলে পাইকারি বাজারেই দাম বেড়ে গেছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। মিরপুর-৬ কাঁচাবাজারের সবজিবিক্রেতা মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে আড়ত থেকে কম মাল আসছে। পরিবহনখরচও বেড়েছে। আমরা বেশি দামে কিনে আনছি বলেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
একই বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান বলেন, দুই দিন আগেও যে পেঁপে ৪০ টাকায় কিনেছি, আজ ৬০ টাকা চাচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম এক লাফে বেড়ে গেছে। প্রতিবার বৃষ্টি হলেই একই চিত্র দেখা যায়। তিনি বলেন, শুধু সবজিই নয়, মাছের বাজারেও বেড়েছে দাম। বাজারে বড় তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, ছোট তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২২০ টাকা, রুই ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতল ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, পাঙ্গাশ ২০০ টাকা, কৈ ২০০ থেকে ২২০ টাকা, টেংরা ও শিং ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চিংড়ি ৮০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে ইলিশের দামও এক হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
দুয়ারিপাড়া বাজারে মাছবিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, বৃষ্টির কারণে নদী ও ঘের থেকে মাছ সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। অনেক ট্রাক সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারছে না। তাই প্রায় সব মাছের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। এ দিকে গোশতের বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা থাকলেও ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা, দেশী মুরগি প্রায় ৭০০ টাকা, গরুর গোশত ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির গোশত প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন জেলায় সবজি উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি সবজির ক্ষেত্রে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ ঘটলে বাজারে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দেয়। একই সাথে পরিবহনব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও দাম বাড়ার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মৌসুমি দুর্যোগ বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছু পণ্যের সরবরাহ কমতেই পারে। কিন্তু সেই সুযোগে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়। বাজারে নিয়মিত মনিটরিং বাড়াতে হবে এবং সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজার এখনো আবহাওয়ার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতেই যদি বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে। কোল্ড চেইন, আধুনিক গুদাম এবং দ্রুত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এ ধরনের অস্থিরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনে বিশেষ ব্যবস্থা, পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত নজরদারি এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অন্যথায় সাময়িক আবহাওয়াজনিত সঙ্কটও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়িয়ে তুলবে।



