নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিশ্ব সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোরালো সহযোগিতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কটের দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রী গতকাল রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) কর্তৃক আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস : ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেন জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক রাডারে সর্বদা সক্রিয় থাকে এবং অন্য কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সঙ্ঘাত বা সঙ্কটের আড়ালে চাপা পড়ে না যায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ প্রচেষ্টা ও কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে দ্রুত মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো: ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রশাসনিক সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব রাজনীতির নেতৃস্থানীয় দেশসমূহ এবং জাতিসঙ্ঘের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এ সঙ্কটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান করা সম্ভব। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসঙ্ঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাসহ (ইউএনএইচসিআর) সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই-আশ্রিত প্রায় ১.৫ মিলিয়ন (ইউএনএইচসিআর -এর হিসাবে ১.২ মিলিয়ন) বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিককে (এফডিএমএন) যেন আমরা পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারি। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তা ও নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয়, খাদ্য, জমি, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় জীবনধারণের মৌলিক নিরাপত্তা প্রদান করে আসছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ক্যাম্প সংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় নাগরিক উভয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া ও সুনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত ব্যবস্থার মতো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার প্রতি স্মরণ করিয়ে মন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সফল নেতৃত্বে এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী কূটনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশ সফলভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করেছিল। অতীতের সেই সফল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুযোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বর্তমান সরকার আবারো শতভাগ সফল প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।
মন্ত্রী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ গঠিত হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সমন্বয়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে অপর একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি সক্রিয় রয়েছে। তিনি বলেন, বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সরকার একটি সর্বাত্মক ‘হোল-অফ-গভর্নমেন্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রদত্ত মানবিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদকে কমিয়ে দিতে পারে। তাই জরুরি ত্রাণ সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের দ্রুত একটি ‘ট্রানজিশনাল স্ট্র্যাটেজি’ বা রূপান্তরকালীন কৌশলে যেতে হবে- যার মূল লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ ও ফিরে যাওয়ার উপযোগী উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।
আইজিসিএফ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে গোলটেবিল আলোচনাটি শুরু হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী।
গোলটেবিল আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন, বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী সেলের প্রধান ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সঙ্ঘাত অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, আইইউবির অধ্যাপক ড. কাজী মাহমুদুল রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নুরুল হুদা সাকিব এবং ইউল্যাব-এর সহকারী অধ্যাপক মিসেস অবন্তী হারুন, অ্যাকশন-এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং দৈনিক প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি রাহীদ এজাজ প্রমুখ।



