ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬

নিরাপত্তায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি

নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ সামনে রেখে সারা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে মাঠে নামানো হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল জনবল। ডগ স্কোয়াড, ড্রোন নজরদারি, বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি এবং প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ সামনে রেখে সারা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে মাঠে নামানো হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল জনবল। ডগ স্কোয়াড, ড্রোন নজরদারি, বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি এবং প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা দুই পর্বে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্বে যারা ইতোমধ্যে মোতায়েন আছেন, তারা দায়িত্বে বহাল থাকবেন। দ্বিতীয় পর্বে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদার করা হবে, যা চলবে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট সাত দিন।

তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের ভেতর ও বাইরে নিরাপত্তা, মোবাইল টহল এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স, সবকিছুর সমন্বয় থাকবে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনে। এ বিষয়ে গত ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে।

আসনভিত্তিক কেন্দ্রের চূড়ান্ত গেজেট : ভোটার পৌনে ১৩ কোটি : এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের এই নির্বাচনে থাকছে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র। যাতে থাকবে দুই লাখ ৪৫ হাজারের বেশি ভোটকক্ষ। সংসদ ও গণভোট একসাথে হওয়ায় প্রতি ভোটকক্ষে সিল দেয়ার গোপনকক্ষ (মার্কিং প্লেস) বাড়ানো হয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সব আসনের ভোটকেন্দ্রের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিরাপত্তার নিরিখে ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ দিকে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী ভোটের তারিখের কমপক্ষে ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হয়। এ এম এম নাসির উদ্দিন কমিশন সব আসনের চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদনের পর ১৫ জানুয়ারি থেকে ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ শুরু করেছে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী ও দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তির জন্য অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৫ লাখ ৩৩ হাজারেরও বেশি নাগরিক নিবন্ধন সেরেছেন।

ভোটকেন্দ্রের গেজেটে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার নাম, উপজেলা, ইউনিয়ন, ভোটকেন্দ্রের নাম ও অবস্থান, ভোটার এলাকার নাম, ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা (নারী, পুরুষ, হিজড়া) তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যাও তুলে ধরা হয়েছে গেজেট। পোস্টাল ব্যালট পেপার গণনাকেন্দ্রের নাম ও অবস্থান, পোস্টাল ভোটারের সংখ্যার উল্লেখ রয়েছে।

৩০০ আসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিটি কেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৮ জন নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।

সশস্ত্রবাহিনীর ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ : নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপির পাশাপাশি ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন থাকবেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও র‌্যাব একযোগে মাঠে থাকবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠন করা হবে। এসব সেলে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সশস্ত্রবাহিনী ও কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি থাকবেন, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয়।

ড্রোন ও ডগ স্কোয়াডে নজরদারি : এবারের নির্বাচনের অন্যতম নতুন দিক হচ্ছে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াডের ব্যাপক ব্যবহার। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৪২৮টি ড্রোন নির্বাচনকালীন নজরদারিতে ব্যবহৃত হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ২০০টি, নৌবাহিনীর ১৬টি, বিজিবির ১০০টি, পুলিশের ৫০টি, কোস্টগার্ডের ২০টি, র‌্যাবের ১৬টি এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১৬টি ড্রোন থাকবে।

ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হবে বিস্ফোরক, অস্ত্র ও সন্দেহভাজন বস্তু শনাক্তে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র, পরিবহন কেন্দ্র এবং জনসমাগমস্থলে এই ডগ স্কোয়াড মোতায়েন থাকবে।

প্রায় ৯ লাখ সদস্যের বিশাল বাহিনী : নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সর্বমোট আট লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক লাখ, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ জন (এর মধ্যে স্থলভাগে এক হাজার ২৫০), পুলিশের এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের তিন হাজার ৫৮৫ এবং র‌্যাবের সাত হাজার ৭০০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সহায়ক বাহিনী হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্যও মাঠে থাকবেন।

ভোটকেন্দ্রের ঝুঁকি মূল্যায়ন : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে আট হাজার ৭৮০টি কেন্দ্রকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’, ১৬ হাজার ৫৪৮টি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ১৭ হাজার ৪৩৩টি কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের জন্য ২৫ হাজার বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যাতে দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।

সিসিটিভি ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’ : প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সিসিটিভি নজরদারি নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং যেকোনো অনিয়ম দ্রুত শনাক্তে সহায়ক হবে।

নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির আরেকটি বড় সংযোজন হচ্ছে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’। ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) প্রস্তুত করা এই অ্যাপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম সরাসরি যুক্ত থাকবে।

জরুরি পরিষেবা নম্বর ৯৯৯-এ একটি বিশেষ নির্বাচনকালীন টিম গঠন করে এই অ্যাপ ও সমন্বয় সেলের সাথে যুক্ত করা হবে। ফলে নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ বা তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।

কঠোর বার্তা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপতৎপরতা কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে মাঠপর্যায়ের বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

সব মিলিয়ে, বিপুল জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে এবারের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।