‘মা, আমি একটু আসছি।’
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মাকে এটুকুই বলেছিল ১৫ বছরের শাহরিয়ার হাসান আলভী। মা বারবার বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু সেই বের হওয়াই ছিল তার শেষ যাত্রা। সেদিন রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায় নবম শ্রেণীর এই শিক্ষার্থী।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আলভীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ তার পরিবার। তাদের অভিযোগ, মামলা করার পর থেকে হুমকি, ভাঙচুর ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। এমনকি নিরাপত্তার আশঙ্কায় কয়েকবার বাসাও পরিবর্তন করতে হয়েছে। একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোক বুকে নিয়েই তারা এখন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচারের অপেক্ষায়।
বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার একটি নিম্নআয়ের পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলেন শাহরিয়ার হাসান আলভী। ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম। ঢাকার মিরপুরের কালশীর দেশ পলিটেকনিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও আগ্রহী ছিলেন বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। বাবা মো: আবুল হাসান ও মা সালমা বেগমের স্বপ্ন ছিল, ছেলে বড় হয়ে কম্পিউটার প্রকৌশলী হবে এবং পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেবে। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট সকালে আলভী বাসা থেকে বের হয়। দুপুরে একবার ফিরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বাইরে যায়। এরপর আর তার সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। বিকেল গড়িয়ে গেলেও ছেলে বাড়ি না ফেরায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন স্বজনরা। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরিবার জানায়, মিরপুর-১০ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কিছু সময় আলভী সড়কেই পড়েছিল। পরে কয়েকজন আন্দোলনকারী তাকে উদ্ধার করে আজমল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন।
মাগরিবের আজানের সময় কয়েকজন আন্দোলনকারী অটোরিকশায় করে আলভীর লাশ বাসার সামনে নিয়ে আসেন। সেই মুহূর্তের স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে বাবা মো: আবুল হাসানকে।
তিনি বলেন, ‘বাসা থেকে নিচে নেমে দেখি দুই বন্ধুর কোলের ওপর আমার ছেলের নিথর দেহ। তখনই বুঝেছিলাম, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।’
শোকের মধ্যেও দাফনের প্রস্তুতি ছিল কঠিন। সেদিনের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে প্রথম দিকে কয়েকটি মসজিদ থেকে গোসলের জন্য খাটিয়া পাওয়া যায়নি। পরে একটি মসজিদ থেকে ব্যবস্থা হলে গোসল, জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। সেদিন রাতেই মিরপুরের কালশী কবরস্থানে আলভীকে দাফন করা হয়। পরিস্থিতির কারণে অনেক স্বজন শেষবারের মতো তার মুখও দেখতে পারেননি।
দুই বছর পরও সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তার বাবা-মা। একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোক যেন প্রতিদিন নতুন করে ফিরে আসে।
আবুল হাসান বলেন, ‘আমার ১৫ বছরের ছেলের কী অপরাধ ছিল? কেন তাকে গুলি করা হলো? যারা আমার পরিবারকে নিঃস্ব করেছে, তাদের বিচার চাই।’
আলভীর মৃত্যুর পর পরিবারের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। স্বজনরা জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের দিন রাতেই তাদের বাসায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুর করা হয়। জানালার কাচ ভেঙে ফেলা হয়। এ ছাড়া, মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ফোনে হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ঘটনার কারণে নিরাপত্তাহীনতায় গত দুই বছরে তিনবার বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। বর্তমানে অন্য বাসায় থাকলেও মাঝেমধ্যে ফোনে হুমকি আসে।
আলভীর পরিবার জানায়, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় তারা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাননি। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও মামলাটি এখনো শুনানির পর্যায়ে আসেনি। বারবার সময় গড়ালেও কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় তারা হতাশ।
পরিবারের প্রত্যাশা, পলাতক অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে, বিচারাধীন মামলাগুলোর কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেয়া হবে এবং আদালতের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। তাদের বিশ্বাস, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হলে শুধু তাদের পরিবারই নয়, একই ধরনের ঘটনার অন্যান্য ভুক্তভোগী পরিবারও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে।



