বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত একসময় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশীয় নীতিগত জটিলতা, ডলার সঙ্কট, বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তা, দুর্বল দেশীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বাজার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কটের কারণে দেশী-বিদেশী উভয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিনিয়োগের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশী স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৫ শতাংশ কমে মাত্র ৬০ লাখ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন সময়ে এই পতন ঘটল, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফিনটেক, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবাভিত্তিক স্টার্টআপে বিনিয়োগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব ছাড়াও দেশের নীতিগত জটিলতা, ডলারসঙ্কট, বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল দেশীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বাজার বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতকে গভীর সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ খাতের উত্থান ছিল অনেকটাই বিদেশী মূলধননির্ভর। ২০২১ সালে দেশের স্টার্টআপগুলো প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেয়েছিল। সে সময় ডিজিটাল সেবা, ই-কমার্স, লজিস্টিকস, ফিনটেক ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসাকে ঘিরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বাজারে মন্দা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে সতর্কতার কারণে অর্থপ্রবাহ কমতে থাকে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের স্টার্টআপে বিনিয়োগ নেমে আসে প্রায় চার কোটি ১০ লাখ ডলারে, যা ছিল ছয় বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। ২০২৫ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও এর বড় অংশ ছিল কয়েকটি বড় চুক্তি ও কৌশলগত লেনদেনকেন্দ্রিক। ফলে সামগ্রিকভাবে নতুন ও প্রাথমিক পর্যায়ের স্টার্টআপগুলোর অর্থায়ন সঙ্কট কাটেনি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বিদেশী বিনিয়োগের ওপর অতিনির্ভরতা। গত এক দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশী স্টার্টআপগুলো যে বিপুল বিনিয়োগ পেয়েছে, তার খুব সামান্য অংশ এসেছে দেশীয় উৎস থেকে। লাইটক্যাসলের তথ্যে দেখা যায়, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশী স্টার্টআপগুলো ৪৬০টির বেশি বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় সাত কোটি ৬০ লাখ ডলার বা মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলের আগ্রহ কমে গেলে সেই শূন্যতা পূরণ করার মতো শক্তিশালী স্থানীয় বিনিয়োগভিত্তি দেশে গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশের ব্যাংকনির্ভর আর্থিক কাঠামোও স্টার্টআপ অর্থায়নের বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রচলিত ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে জামানত, স্থায়ী আয়, পূর্বের আর্থিক ইতিহাস এবং নির্দিষ্ট নগদ প্রবাহকে গুরুত্ব দেয়া হয়। অন্যদিকে অধিকাংশ স্টার্টআপ শুরুতে লোকসানে থাকে এবং তাদের মূল সম্পদ প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, সফটওয়্যার, মেধাস্বত্ব ও ব্যবসায়িক ধারণা। এসব সম্পদ ব্যাংকঋণের জন্য সহজে জামানত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু অনুদান পেলেও ব্যবসা সম্প্রসারণের সময় বড় অঙ্কের অর্থায়ন সঙ্কটে পড়েন। এ খাতের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধরনের ব্যবসার সাথে অনেক প্রচলিত আইন ও বিধিমালার সামঞ্জস্য নেই। ফলে নতুন ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা কখনো নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তায় পড়েন। বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি দেশের নীতিগত স্থিতিশীলতা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়ার গতি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘসূত্রতা ও নীতির অস্পষ্টতা বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
তারা বলছেন, বিশ্বব্যাপী স্টার্টআপ বিনিয়োগের ধরনও বদলেছে। কয়েক বছর আগে দ্রুত ব্যবহারকারী বাড়ানো এবং বড় বাজার দখল করাকে অনেক বিনিয়োগকারী প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করতেন। এখন বিনিয়োগকারীরা আয়, মুনাফার সম্ভাবনা, ইতিবাচক নগদ প্রবাহ, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে শুধু নতুন ধারণা বা দ্রুত প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বড় বিনিয়োগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের অনেক স্টার্টআপ এখনও ব্যবসায়িক মডেলকে টেকসই পর্যায়ে নিতে পারেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করলেও লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করতে সময় নিচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে বলে তারা মনে করেন।
বিডি জবস এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) ফাহিম মাসরুর নয়া দিগন্তকে বলেন, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেয়ার সংস্কৃতিও দেশে এখনো সীমিত। অনেক স্থানীয় বিনিয়োগকারী জমি, আবাসন, শেয়ারবাজার, আমদানি-বাণিজ্য বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় বিনিয়োগকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। স্টার্টআপে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, ব্যবসা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি এবং বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার সীমিত সুযোগ তাদের নিরুৎসাহিত করে। দেশে কার্যকর এক্সিট বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের বাজার গড়ে না ওঠায় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলগুলোর ঝুঁকিও বেড়েছে। সম্ভাবনাময় একটি স্টার্টআপ বড় হলেও শেয়ার বিক্রি, অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত হওয়া বা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর লাভ তুলে নেয়ার পথ এখনো সীমিত। তিনি বলেন, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা। বিদেশী তহবিল কোনো দেশে বিনিয়োগ করার সময় শুধু ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে না; তারা বিনিয়োগের অর্থ প্রবেশ, মুনাফা প্রত্যাবাসন, শেয়ার বিক্রির অর্থ বিদেশে নেয়া এবং বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াও বিবেচনা করে।
অনলাইন গ্রোসারি ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম চালডালের প্রধান নির্বাহী (সিইও) ওয়াসিম আলিম নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে ডলারবাজারে অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং অর্থ স্থানান্তরসংক্রান্ত জটিলতা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখনো বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব কারণে দীর্ঘমেয়াদি ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তহবিলগুলো আরো সতর্ক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, নীতিগত জটিলতাও বিনিয়োগ কমার অন্যতম কারণ। স্টার্টআপ নিবন্ধন, বিদেশী বিনিয়োগ অনুমোদন, শেয়ার ইস্যু ও হস্তান্তর, কোম্পানির মূল্য নির্ধারণ, করনীতি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রত্যাবাসন প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন ও পৃথক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু সরকারি তহবিল বাড়িয়ে স্টার্টআপ খাতের সঙ্কট দূর করা সম্ভব নয়। বিদেশী বিনিয়োগ সহজ করতে দ্রুত ও স্বচ্ছ অনুমোদনব্যবস্থা, বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা এবং স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। একই সাথে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে কর প্রণোদনা, করপোরেট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট নেটওয়ার্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। স্টার্টআপের শেয়ার মূল্যায়ন, রূপান্তরযোগ্য বিনিয়োগ এবং কর্মীদের শেয়ার মালিকানা পরিকল্পনার জন্য আধুনিক আইন ও নীতিমালা তৈরি করাও জরুরি।



