গণভোট ঘিরে বিভ্রান্তির রাজনীতি

‘হ্যাঁ’ ভোটে সরকারি কর্মচারীদের প্রচারে আইনগত বাধা নেই : আলী রীয়াজ

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে ব্যস্ত থাকলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে তোড়জোড় কম। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজ প্রতীকের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সিল মারার প্রচারণা চালালেও সেটা জোরালো নয়। বিএনপির পক্ষে এ নিয়ে প্রচারণা নেই বললেই চলে। মাঠ পর্যায়ে বিএনপির অনেক নেতাকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। একই দিন সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে ব্যস্ত থাকলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে তোড়জোড় কম। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজ প্রতীকের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সিল মারার প্রচারণা চালালেও সেটা জোরালো নয়। বিএনপির পক্ষে এ নিয়ে প্রচারণা নেই বললেই চলে। মাঠ পর্যায়ে বিএনপির অনেক নেতাকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। যদিও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে যাওয়ার সুযোগ নেই বিএনপির। কিন্তু, মাঠ পর্যায়ে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে না দলটিকে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার পক্ষে মাঠে নামার উদ্যোগ নিলেও তা সেভাবে হচ্ছে না। বরং উল্টো প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা করতে পারেন কি না। এ ছাড়াও, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেয়া নিয়েও মাঠে নেমেছে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী। গণভোট নিয়ে যখন বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের ঢেউ উঠেছে, তখন অন্তর্বর্তী সরকার একে দেখছে রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা নিয়ে প্রচলিত আইনে বা সংবিধানে কোনো বাধা নেই বলে স্পষ্ট করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টার মর্যাদায়) অধ্যাপক আলী রীয়াজ ও মনির হায়দার (সিনিয়র সচিব মর্যাদায়)। প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে বিভাগীয় পর্যায়ের মতবিনিময় করছেন তারা। গতকাল রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসনের আয়োজনে ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে বিভাগীয় মতবিনিময় সভা’ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ, বিশেষ অতিথি ছিলেন মনির হায়দার। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে মতবিনিময় গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো: নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) রেজাউল করিম মল্লিক বক্তব্য রাখেন। সভায় ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলোর ডিসি, এসপিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।

কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আলী রীয়াজ বলেন, আপনাদের পক্ষ থেকে বার বার একটা প্রশ্ন করা হচ্ছে, প্রশ্নটা হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা করতে পারে কি না? তিনটি আস্পেক্ট থেকে প্রশ্নটির উত্তর দিতে হবে। প্রথমটা হলো আইনি বিষয়। বাংলাদেশের সংবিধানে কোথাও নেই যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবে না। বিদ্যমান আইনে কোথাও নেই যে যে বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে সে বিষয়ের জনগণের কাছ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোট চালাতে পারবে না, এমনটা নেই। সংবিধান ও আইনের বিষয়ে যারা বিজ্ঞ, বিচারপতি, সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সাথে বসেছিলাম। তারাও বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় কোনো বাধা নেই।

আরেকটি হচ্ছে নির্বাচনী আচরণবিধি (আরপিও), এতেও কোনো বাধা নেই। বাকি যেটা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার)- ২০২৫ বাস্তবায়ন আদেশ- সেখানে তো বলা হয়নি যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো যাবে না। গণভোটের অধ্যাদেশের কোথাও নেই। তা হলে আইনিভাবে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন কোনো অবস্থাতেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় কোনো বাধা দিচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত, কেউ কেউ বলছেন, আইনে বাধা নেই কিন্তু, নৈতিকভাবে বাধা আছে। কিসের নৈতিক বাধা বলেন তো? তারা বলার চেষ্টা করে, সরকারের তো নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। ওনাদের অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করি (যারা এসব বলে), এই সরকার রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আপনি কী এই সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মনে করেন যে, নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে? এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। এটা অন্তর্বর্তী সরকার, যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সংবিধানের চার দেয়ালের মধ্যে নয়। বাংলাদেশের রাজপথে ১৪০০ মানুষের রক্তের মধ্য দিয়ে এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এইটা মনে রাখুন। নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছেন তো? আসুন আমরা নৈতিকতার প্রশ্ন তুলি। নৈতিকতা হচ্ছে ওইসব মানুষের আত্মদান। একটা ফ্যাসিবাদী শাসক যে, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে কী কারণে?

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের অভিপ্রায়ের কথা বলা হয়েছে, সেটা দেশের রাজপথে অর্জিত হয়েছে (জুলাই-আগস্ট), সেই অভিপ্রায়ের আলোকে এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আপনি বলুন সংবিধানে কোথায় অন্তর্বর্তী সরকার আছে? প্রথম দিন থেকে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার স্পষ্ট করে বলেছে যে, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে এক নম্বর সংস্কার, দুই নম্বর বিচার, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে এবং তিন নম্বরে নির্বাচন।

আলী রীয়াজ বলেন, সরকার কোনো কিছু চাপিয়ে দিচ্ছে না। সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন করা হয়েছিল। এসব কমিশনের সুপারিশ থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ৯ মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করেছে। দলগুলো যখন জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ স্বাক্ষর করেছে, তারপর সরকার বলছে এটা আমরা জনগণের সম্মতি চাই। চাই কী জন্য? ভবিষ্যতের জন্য। গণভোটে যেসব বিষয় দেয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন করবেন নির্বাচিত জনপ্রতিধিরা। যে কারণে বলা হয়েছে আগামী জাতীয় সংসদ ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। আগামী সংসদ প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। বাকি সময় তারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ হিসেবে কাজ করবে। তাদেরকে বলা হচ্ছে যে এটাকে (জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কার বিষয়ক বিষয়গুলো) সংবিধানে সংযুক্ত করবে। তা হলে যে, প্রশ্ন তুলছেন সরকারি কর্মচারীরা নৈতিকভাবে পারে কি না? যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো রক্তের উপরে। যে সরকার এজেন্ডা হিসেবে বললো যে আমি সংস্কার করবো। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বসে জাতীয় এজেন্ডা তৈরি হলো। তার চেয়ে নৈতিক ভিত্তি আর কিসে থাকতে পারে? আপনারা যদি মনে করেন যে, এটা একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, এটার কাজ হচ্ছে ৯০ দিনের মধ্যে একটা নির্বাচন করে বাড়ি চলে যাবেন, তা হলে এটা বিশ^াসঘাতকা হবে জুলাইযোদ্ধাদের সাথে।

বাংলাদেশের মানুষের নৈতিক অবস্থান থেকে এটা সুস্পষ্ট করা দরকার, এই জুলাই জাতীয় সনদ এটা ইউনূস সরকারের এজেন্ডা নয়। এটা কাউকে ক্ষমতায় বসানোর এজেন্ডা নয়। কাউকে ক্ষমতা থেকে বাইরে রাখার বিষয় নয়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মনির হায়দার চৌধুরী বলেন, গণভোট ২০২৬-এ একটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হবে, আমরা আবার ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে আনতে চাই কী চাই না। তিনি বলেন, গণভোট ২০২৬ দেশের সব মানুষের এজেন্ডা। এটি ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু কোনো কারণে যদি এটি ব্যর্থ হয় (হ্যাঁ ভোট না জেতে) তা হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবেই এবং দ্রুততম সময়ে আসবে। একবার কোনো পথ যদি কেউ চিনে যায় দ্বিতীয়বার সেটা চিনতে সময় কম লাগে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ আসতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছে। ফ্যাসিবাদ রাস্তাঘাট চিনে গেছে। আপনারা যারা ব্রুক্রেসিতে আছেন, তারা আমাদের চেয়ে আগে টের পাবেন, এর পরে যদি ফ্যাসিবাদ আসে, মনির হায়দার বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’- ভোট নিয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার হচ্ছে। বলা হচ্ছে ‘হ্যাঁ ভোট জিতলে এটা হবে, ওটা থাকবে না, ইত্যাদি। এই মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের বিষয়ে আপনাদের জনগণকে সঠিক তথ্যটা পৌঁছে দিতে হবে।