অদৃশ্য খরচই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে : বাণিজ্যমন্ত্রী

কৃষক থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে : সিপিডি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

অদৃশ্য খরচই মূল্যস্ফীতি চাপ বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুকতাদির। অন্য দিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, কৃষক থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। কৃষকপর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। ফলে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হচ্ছে।

সিপিডির ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল : বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফার ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত সংলাপে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন সিপিডির সিনিয়র গবেষক ফকরুদ্দিন আল কবির। এ অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

সিপিডির একই গবেষণায় বলা হয়েছে, একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালে দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচামরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর গোশতে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে দাম বাড়ছে ২২ শতাংশ।

সিপিডির গবেষণায় দেশের ৮১০টি বাজার ঘুরে ১০টি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই পর্যায়ে দাম বাড়ে না; বরং পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, চাল উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে মিলার পর্যায়েই কেজিপ্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে।

ডালের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা সবচেয়ে বেশি মূল্য বাড়ান। একই চিত্র মরিচের বাজারেও দেখা গেছে। মরিচের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা গড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেন।

অন্য দিকে বেগুন ও আলুর বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেন খুচরা বিক্রেতারা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রান্তিক পাইকারদের পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমিষ জাতীয় পণ্যের বাজারেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, মাছের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি ঘটে শহরের আড়তদার পর্যায়ে। ডিম ও মুরগির বাজারে পাইকাররা বড় ভূমিকা রাখেন। আর গরুর গোশতের ক্ষেত্রে ব্যাপারীদের হাত ধরে কেজিপ্রতি গড়ে প্রায় ৭৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়।

বাণিজ্যমন্ত্রী যা বললেন

লজিস্টিকসের বাড়তি কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে বেশি জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের লজিস্টিকস কস্ট হাই। সারা পৃথিবীর অ্যাভারেজ লজিস্টিকস কস্ট স্ট্যান্ডার্ড দেখলে দেখবেন তা জিডিপির ১০ শতাংশ। আমাদের এখানে ১৬ শতাংশ। আমাদের এখানে সমস্যা অনেক।

তিনি বলেন, এসব সমস্যা থেকে বের হতে হলে লজিস্টিকস কস্ট কমাতে হবে, ইনপুট কস্ট কমাতে হবে। পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি কমাতে হবে। কমানোর এই লাইনগুলো ধরার জন্য আমরা অনেকগুলো আইটেমের ওপর ট্রেসিবিলিটি করতে যাচ্ছি। এটি যদি আমরা করে ফেলতে পারি তাহলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে তা আমরা চিহ্নিত করতে পারব।

কৃষক বাজার সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য পান না জানিয়ে তিনি বলেন, দুই বছর ধরে এক কোটি টনের ওপরে আলু উৎপাদন করি। দুই বছর আগেও কৃষক টাকা পাননি। গত বছরও পাননি। না পাওয়ার পরও আবার এক-তৃতীয়াংশ আমাদের কনজামশনের বাইরে থাকার পরও কেন কৃষক তৃতীয় বছরেও সমপরিমাণ আলু উৎপাদন করতে যাচ্ছে? তার মানে কৃষকের কাছে সঠিক তথ্যটা যাচ্ছে না। অথবা এই সহজ চাষটা বাদ দিয়ে এই জায়গায় কী রিপ্লেসমেন্টে সে যেতে পারে, এটির জন্য তার কাছে প্রপার ইনপুট নেই।

তিনি বলেন, আমরা আমেরিকা কিংবা সৌদি আরব নই। মাটির নিচে অফুরন্ত তেল-গ্যাস নেই আমাদের। কিন্তু আমাদের কৃষিজমি আছে। সেটার পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। কৃষি একটি নাজুক খাত, এখানে সবসময়ই সরকারের নজর দিতে হবে, সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এমনি এমনি ছেড়ে দেয়া যাবে না। খাদ্য নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। কিন্তু বিষয়টি নাজুক।

প্রডাক্টিভিটি আমরা যত বাড়াবো, তত ফার্মারের এবিলিটিও আসবে, সে অ্যাগ্রিগেট ভ্যালু তত বেশি পাবে বলে জানান মন্ত্রী।

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, যেকোনো অর্থনীতির ওপরে মূল্যস্ফীতি একটা পেইন। যত সমৃদ্ধশীল অর্থনীতি হোক, যার পারচেজিং পাওয়ার অনেক হাই তার জন্যও পেইন। আর আমাদের মতো স্ট্রাগলিং ইকোনমির জন্য মূল্যস্ফীতি অনেক বড় পেইন।

অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি আমাদের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে।

গার্মেন্টশ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, খাদ্যমূল্য বাড়লে নি¤œ আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি কমে যায়। তাই বাজারে কার্যকর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।

সাবেক সচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আগে সরকার ধান ও গমের বাজারে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করত। দাম বেড়ে গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং দাম কমে গেলে কৃষকদের সহায়তা দেয়া হতো। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবে সরকারের সেই ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, শুধু কর কমিয়ে বাজারে দাম কমানো সম্ভব হয় না। এ জন্য সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তিনি ২০০৮ সালের একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভোজ্যতেলের ওপর ভ্যাট কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা লিখিতভাবে দাম কমানোর নিশ্চয়তা দিতে রাজি হননি। কারণ শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এতে বোঝা যায়, বাজারব্যবস্থার ভেতরেই কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, যা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুবিধা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। অনেক কৃষক এখনো কৃষিঋণ থেকেও বঞ্চিত।

কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা উন্নত করা। কৃষি যখন বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে, তখন বাজার ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। তাই বাজার ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ করবে।