বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরে একটি কাঠামোগত বৈপরীত্যের ভেতর দিয়ে চলছে। একদিকে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, অন্যদিকে বাড়তে থাকা ভর্তুকি ও আর্থিক ঘাটতি। এই সঙ্কটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বহুল আলোচিত কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট বিষয় ক্যাপাসিটি চার্জ। সরকার ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ঘোষণা দিয়েছিল যে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর ধীরে ধীরে ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জুলাই পেরিয়েও এই চার্জ বহাল থাকছে, এতে আর্থিক বোঝা আরো গভীর হচ্ছে।
ক্যাপাসিটি চার্জ কী এবং কেন এটি সঙ্কটের উৎস
ক্যাপাসিটি চার্জ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু থাকুক বা না থাকুক, নির্দিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদনসক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সরকার বা পিডিবিকে যে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এই ব্যবস্থাটি মূলত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র আকৃষ্ট করার জন্য চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি একটি অদক্ষ, একচেটিয়া ও লুটপাটমুখী কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮-৩০ হাজার মেগাওয়াট, যেখানে সর্বোচ্চ চাহিদা গড়ে ১৬-১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয়। অর্থাৎ, অর্ধেকের কাছাকাছি বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যত অলস পড়ে থাকলেও তাদের জন্য নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
সরকার বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছিল, ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনা হবে। বাস্তবে জুলাই পেরিয়ে গেলেও কিছুই বদলায়নি। বরং রামপাল ও মাতারবাড়ীর মতো ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প যুক্ত হয়ে এই চার্জকে আরো স্থায়ী, অনিবার্য ও ভয়াবহ করে তুলছে।
ক্যাপাসিটি চার্জ : বিনিয়োগ সুরক্ষা নাকি লুটের লাইসেন্স
ক্যাপাসিটি চার্জের যুক্তি ছিল, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কত দিন এই অজুহাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট চলতে পারে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট, অথচ চাহিদা সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস। তবুও সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, বরং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা ধরে রাখার জন্য। এটি আর নীতি নয়, এটি একটি চুক্তিভিত্তিক চাঁদাবাজি ব্যবস্থা।
ক্যাপাসিটি চার্জ বহাল কার স্বার্থে
সরকার বলছে, চুক্তি বাতিল করলে আন্তর্জাতিক মামলা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই চুক্তিগুলো কারা করেছিল? কিভাবে দরপত্র ছাড়া, প্রতিযোগিতা ছাড়াই শত শত বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হলো? কেন চাহিদা বিশ্লেষণ ছাড়াই উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করা হলো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে সরকার আজ বলছে, ‘আমরা বাধ্য’। বাস্তবে সরকার বাধ্য নয়, সরকার বন্দী নিজেদেরই করা অপরিণামদর্শী ও সুবিধাভোগী চুক্তির কাছে।
রামপাল : পরিবেশ ধ্বংসের পর অর্থনৈতিক বিপর্যয়
রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু থেকেই বিতর্কিত। সুন্দরবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সরকার তখন বলেছিল, সবই নিয়ন্ত্রিত। বিদ্যুৎ হবে সস্তা ও নিরবচ্ছিন্ন।
আজ বাস্তবতা ভিন্ন। কয়লা আমদানিনির্ভর, ডলার সঙ্কটে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত, উৎপাদন ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ও ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম গ্যাস বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির চেয়ে ব্যয়বহুল। এর ওপর রয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ। রামপাল পূর্ণ সক্ষমতায় না চললেও জনগণকে পূর্ণ মূল্য দিতে হচ্ছে। তাই বলা যায়, এটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, এটি একটি চিরস্থায়ী আর্থিক দায়।
সরকার বারবার বলে, ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ভর্তুকি তো সরকারের নিজস্ব অর্থ নয়, এটি জনগণের কর। এতে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। এতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার বরাদ্দ সঙ্কুচিত হচ্ছে, আর বিদ্যুৎ খাতে ঢালা হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা, কিছু চুক্তিবদ্ধ গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করতে।
দায় কার?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সঙ্কট প্রাকৃতিক নয়, দুর্ঘটনাজনিত নয়। এটি তৈরি করা হয়েছে- পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের, ভুল পরিকল্পনা, কমিশন বাণিজ্য, রাজনৈতিক তাড়াহুড়ো, স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিহীন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ দায় নেয়নি। কোনো শ্বেতপত্র নেই, কোনো স্বাধীন অডিট নেই, নেই চুক্তি প্রকাশের সদিচ্ছা।
সমাধান কী হতে পারে
সরকার বলছে, ধীরে ধীরে সংস্কার হবে। কিন্তু বাস্তবে নতুন প্রকল্প, নতুন চুক্তি, নতুন দায় যুক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে সব বিদ্যুৎ চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জ পুনঃ আলোচনা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া নতুন প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদনে পূর্ণাঙ্গ চাহিদা বিশ্লেষণ ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান চুক্তিগুলো পুনঃ আলোচনার মাধ্যমে ক্যাপাসিটি চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাস্তবভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ এখন আর নীতিগত প্রশ্ন নয়, এটি নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন। রামপাল ও মাতারবাড়ীর মতো প্রকল্প যদি উন্নয়নের নামে জনগণকে আজীবন বিল পরিশোধে বাধ্য করে, তাহলে সেই উন্নয়ন একপ্রকার অর্থনৈতিক দাসত্ব।



