পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) বিধিমালাটি সম্প্রতি চূড়ান্তভাবে সংশোধন করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত ৩০ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫’ নামে গেজেট আকারে প্রকাশের সাথে সাথেই এটি কার্যকর হচ্ছে। ফলে এই বিধিমালার আলোকেই এখন থেকে দেশের দুই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে কোম্পানিগুলো। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গঠিত নতুন কমিশন কর্র্তৃক সংশোধিত এ বিধিমালাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চান পুঁজিবাজারের স্টেক হোল্ডাররা।
দেশের পুঁজিবাজারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শুরু থেকেই এখানে সবচেয়ে বড় সমস্য ছিল ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি। বাজারকে সচল রাখতে অতীতে এখানে কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তিতে বিভিন্নভাবে ছাড় দেয়া হয়েছিল। যার ফলে কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশই পুঁজিবাজারের নানা বিধিবিধান যথাযথ পালন করতে ব্যর্থ হয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে তালিকাচ্যুত হয়েছে। ১৯৯৬ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর বাজার যখন অনেকটা নীভু নীভু তখন বাজার সচল করতে এ ছাড় দেয়া হয়। এর ফলে ওই সময়ে যেসব কোম্পপানি তালিকাভুক্ত হয় তার বেশির ভাগই ২০০৯ সালে মূল বাজার থেকে আলাদা করে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে চলে যায়। একপর্যায়ে এই তালিকায় যুক্ত হয় ৬০-এর বেশি কোম্পানি।
পরে ২০১০ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ে আবার বড় ধরনের সঙ্কটে পড়ে পুঁজিবাজার। সে সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের মধ্যে বাজার চালু রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তখনকার কমিশন বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর নামে তাািলকাভুক্তিতে আবার ছাড়া দিতে থাকেন। তবে ইতোমধ্যে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যেই একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয় যারা বিভিন্ন মৌলভিত্তিহীন কোম্পানির উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসব কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এমনকি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের আপত্তি সত্ত্বেও কিছু কিছু কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য করার কথাও তখন শোনা যায়। আর এর ফলস্বরূপ শুধু ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে নয়, বুক বিল্ডিংয়ের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিও এখন পুঁজিবাজারের জন্য সম্পদ না হয়ে সমস্যা হয়ে বিরাজ করছে। এমনকি একসময় শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির বিধান থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরবর্তী রাজনৈািতক সরকারের নিয়োগ পাওয়া কমিশনের সময় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির বাইরে বেসরকারি কোম্পানিকেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
এ সময় কারণে দেশের পুঁজিবাজার গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে পার করছে এক চরম সঙ্কটের মধ্যে। এবং ২০২৪ সালের পর নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। কিন্তু গত ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন কমিশন গঠন করার পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারীর নিয়োগ দেয়া হয়। সেই সাথে গঠিত হয় পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটি। সংস্কার কমিশনের করা বিভিন্ন সুপারিশের আলোকেই নতুন কমিশন পুঁজিবাজার সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। আইপিও সংশোধিত বিধিমালা তারই একটি।
সংশোধিত বিধিমালায় নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জ আইপিও আবেদনের প্রাথমিক অনুমোদন দেবে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে বিএসইসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। আগে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিএসইসির সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। এ ছাড়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী কোম্পানির ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন হতে হবে ৩০ কোটি টাকা এবং আইপিও-পরবর্তী কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন দাঁড়াতে হবে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকায়। আবার প্রত্যেক কোম্পানিকে তাদের শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ বাজারে ছাড়তে হবে। এ ছাড়া আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের সময়সীমা পাঁচ বছর নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একটি কোম্পানি আইপিও থেকে উত্তোলিত অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ঋণ পরিশোধ বা বিনিয়োগে ব্যয় করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, ওই ঋণ অবশ্যই কোম্পানির প্রকল্প, যন্ত্রপাতি কেনা বা ব্যবসার সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হতে হবে এবং নিরীক্ষকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খেলাপি বা রিশিডিউল করা কোনো ঋণ আইপিওর টাকা দিয়ে পরিশোধ করা যাবে না এবং এ সংক্রান্ত ব্যাংক সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০১৫ সালের বিধিমালার তুলনায় এটি অনেক বেশি কঠোর, যেখানে ঋণের ধরন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট শর্ত ছিল না।
পুঁজিাবাজর সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই বিধিমালাটি আইপিও মূল্য নির্ধারণ, শেয়ার বরাদ্দ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। এখন থেকে ফিক্সড-প্রাইস পদ্ধতিতে প্রিমিয়ামসহ আইপিও আনা যাবে, তবে সে ক্ষেত্রে কোম্পানিকে টানা দুই বছর নিট মুনাফা ও পজিটিভ ক্যাশ ফ্লোসহ অন্তত তিন বছরের বাণিজ্যিক উৎপাদনের রেকর্ড থাকতে হবে। এ ছাড়া বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইএমইআই নির্ধারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্তত চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
নতুন বিধিমালায় আইপিওর আকার নিয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোম্পানিগুলোর আইপিও-পূর্ব পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকা এবং আইপিও-পরবর্তী মূলধন ৫০ কোটি টাকা হতে হবে। এ ছাড়া গ্রিনফিল্ড বা নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে; কোম্পানি মুনাফা না করা পর্যন্ত তারা দুই বছরের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। একই সাথে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে ‘গেটকিপার’ হিসেবে আরো বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যাতে তারা প্রসপেক্টাস যাচাই ও কারখানা পরিদর্শন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘লক-ইন’ পিরিয়ড প্রবর্তন করা হয়েছে, যেখানে তাদের বরাদ্দের শেয়ার ধাপে ধাপে ১৮০ দিন পর্যন্ত আটকে থাকবে। বাজারবিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বল্প মেয়াদে আইপিওর সংখ্যা কিছুটা কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি পুঁজিবাজারের গুণগত মান ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। ২০২৫ সালের এই নতুন বিধিমালা বাংলাদেশের আইপিও মার্কেটকে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার এক নতুন যুগে প্রবেশ করাবে বলে আশা করা হচ্ছে
সংশোধিত নতুন আইপিও বিধিমালা নিয়ে জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন বিধিতে স্টক এক্সচেঞ্জকে কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে প্রধান ভূমিকায় রাখা হয়েছে। এটি খুবই ইতিবাচক। প্রথম দিকে আইপিও অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যবহারের সুযোগ রাখা ছিল না। আপনাদের সুপারিশের পর তা আমলে নেয়া হয়েছে। নতুন আইপিও বিধিমালায় ৩০ শতাংশ অর্থ শর্তসাপেক্ষে ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব কিছুই ইতিবাচক। এ ছাড়া আইপিওর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লটারি সিস্টেম গত কমিশন বাদ দিয়েছিল। এটা আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এসব বিবেচনায় আমরা মনে করছি এ বিধিমালা ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে ভালো ভূমিকা রাখবে।
পূবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী আহসান উল্যা নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন এ বিধিমালায় অনেক সংশোধনী আনা হয়েছে যা এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। তিনি মনে করেন লটারি সিস্টেম আইপিও জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে বাজারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাওয়া শেয়ারে নক-ইন প্রক্রিয়াটিকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। আবার আইপিওর টাকা ব্যবহারেও শর্ত আরোপ ঋণ পরিশোধে ব্যবহার সীমা কমিয়ে আনাও বাজারের জন্য পজিটিভ ভূমিকা রাখবে। এসব বিধিবিধান ঠিকমতো পালন করা হলে পুঁজিবাজারে খুব সহজে মৌলভিত্তিহীন কোম্পানি জায়গা করে নিতে পারবে না। এটা পুঁজিবাজারের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করবে।



