এক সপ্তাহে ডিএসইতে মূলধন বেড়েছে ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

টানা অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার পর দেশের পুঁজিবাজারে কিছুটা ইতিবাচক গতি ফিরেছে। সপ্তাহজুড়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচক, বাজার মূলধন ও লেনদেন- সবকটি প্রধান সূচকেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এ সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে পাঁচ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। একই সময়ে দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৫১ শতাংশ।

তবে বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে সুশাসন নিশ্চিত করা, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

ডিএসইর সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সপ্তাহ শেষে বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৯৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল ছয় লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক সপ্তাহে বাজার মূলধন বেড়েছে পাঁচ হাজার ২১৩ কোটি টাকা বা প্রায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ।

একই সময়ে বাজারের প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৯১ দশমিক ০৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়ে পাঁচ হাজার ৭৪৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক বেড়েছে ২৫ দশমিক ২৮ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ২১ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৬৮ পয়েন্টে। ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা সপ্তাহ শেষে দুই হাজার ১৬২ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

গত এক সপ্তাহে লেনদেনেও ফিরেছে গতি। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৩৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৯৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বেশি। শতাংশের হিসাবে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।

দৈনিক গড় লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিগত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৪৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, যেখানে আগের সপ্তাহে এর পরিমাণ ছিল ৯৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ, দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে ৪৮২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বা ৫০ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে ৩৯১টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২৭২টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৯০টির কমেছে এবং ২৯টির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ, লেনদেন হওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে, যা বাজারের সামগ্রিক ইতিবাচক প্রবণতারই প্রতিফলন।

সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষে ছিল আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, আইটি কনসালট্যান্টস, এনসিসি ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং সিটি ব্যাংক।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত ছিল। সপ্তাহজুড়ে সিএএসপিআই সূচক ১ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং সিএসসিএক্স সূচক ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া সিএসই-৩০, সিএসই-৫০ ও সিএসআই সূচকও ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে ছিল।

তবে সূচক বাড়লেও সিএসইতে লেনদেন কমেছে। সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেন হয়েছে ১৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহের ৩৬০ কোটি ৯২ লাখ টাকার তুলনায় ১৮৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কম। লেনদেন হওয়া ৩২৯টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইউনিটের মধ্যে ২১১টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৮৯টির কমেছে এবং ২৯টির দর অপরিবর্তিত ছিল।

বাজারে ইতিবাচক প্রবণতার মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান সালতা ক্যাপিটাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি সমন্বিত গ্রাহক হিসাব থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা এবং গ্রাহকদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের প্রায় ৭২ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার বিক্রি করে অনিয়ম করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১৪ হাজার গ্রাহক থাকা প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ দুই কর্মকর্তা অভিযোগ ওঠার পর থেকে প্রকাশ্যে আসেননি। বিষয়টি তদন্ত করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি দেশের শেয়ারবাজারে গ্রাহক সম্পদ আত্মসাতের অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সূচক ও লেনদেনের সাম্প্রতিক উন্নতি বাজারে আশাবাদ সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ধারা বজায় রাখতে করপোরেট সুশাসন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কার্যকর তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই।

তাদের মতে, বাজারে শুধু সূচকের ঊর্ধ্বগতি নয়, বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সালতা ক্যাপিটালের মতো ঘটনা বাজারে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করে। তাই ঘটনার দ্রুত তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণই বাজারে ইতিবাচক বার্তা দেবে।

সব মিলিয়ে চলতি সপ্তাহে দেশের পুঁজিবাজারে সূচক, বাজার মূলধন ও লেনদেন- তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে এই ধারা টেকসই করতে হলে বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ তদারকি নিশ্চিত করার ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।