কূটনৈতিক প্রতিবেদক
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কায় ভারতীয় হাইকমিশন ও সহকারী হাইকমিশনগুলো থেকে কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নেয়ার পর রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য স্থানে কর্মরত ভারতীয়রা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আশঙ্কায় বাংলাদেশ ছাড়ছেন। তবে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে এলে তারা আবারো বাংলাদেশে ফিরে আসবেন বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। কেননা এর সাথে ব্যবসাবাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানসহ নানাবিধ বিষয় জড়িত।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, এই পদক্ষেপ ভারতের জন্য ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটা পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশে ভ্রমণ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিল; কিন্তু তাদের জন্য ট্র্যাভেল ইন্সু্যুরেন্স ইস্যু করা হয়নি। কানাডার সরকার বাংলাদেশে আসতে তাদের নাগরিকদের বাধা দিচ্ছে না, তবে কোনো অঘটন ঘটলে তার দায় নিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। গণমাধ্যমে এসব খবর নিয়মিত আসছে। ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলো হয়তো আশঙ্কা করছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ আরো বাড়তে পারে। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত দলের নেতৃবৃন্দের ভারতে আশ্রয় নেয়া, বাংলাদেশ সরকারের বারবার আপত্তি সত্ত্বেও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার এবং সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া, এমনকি ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশটির সাথে উত্তেজনা চলছে। এ পরিস্থিতিতে ভারত হয়তো বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ করেছে। তবে আমি মনে করি, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে- এ কথা ভাবা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, নানা ইস্যুতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে যে ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, তা স্বাভাবিক হতে সময় প্রয়োজন হবে। দুই দেশের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্য ছাড়াও শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর সহযোগিতা ছিল। নির্বাচনের পর সম্পর্কটা আবারো স্বাভাবিক করে আনা দুই দেশের সরকারের জন্যই কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
এ দিকে খুলনার বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নয়জন ভারতীয় কর্মকর্তা গোপনে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমে যে খবর বের হয়েছে তা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) ডিজিএম (এইচআর-পিআর) আনোয়ারুল আজিম। গতকাল দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট ১২ জন এনটিপিসির নির্বাহী কর্মকর্তা শুধু পরামর্শক ভূমিকায় নিয়োজিত ছিলেন। তাদের কাউকে কোনো ধরনের অপারেশনাল দায়িত্ব দেয়া হয়নি। কন্ট্রোলরুমসহ প্ল্যান্টের সব অপারেশনাল কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বিআইএফপিসিএলের স্থানীয় কর্মীদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান ব্যক্তিগত নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে সংশ্লিষ্ট এনটিপিসি পরামর্শক কর্মকর্তারা এনটিপিসি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে এবং প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন নিয়ে ভারতে গেছেন। বর্তমানে এসব কর্মকর্তা দায়িত্বে বহাল রয়েছেন এবং হোয়াটসঅ্যাপ, মাইক্রোসফট টিমস ও ভিডিও কনফারেন্সিংসহ বিভিন্ন ভার্চুয়াল মাধ্যমে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। কোনো অপারেশনাল জরুরি পরিস্থিতি বা প্ল্যান্ট-সংক্রান্ত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার ক্ষেত্রে তারা তাৎক্ষণিকভাবে প্ল্যান্টে উপস্থিত হতে প্রস্তুত আছেন। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উভয় ইউনিট বাংলাদেশ জাতীয় গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। প্ল্যান্টের কর্মক্ষমতা স্থিতিশীল রয়েছে এবং এতে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) সাথে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) যৌথভাবে বাস্তবায়ন করেছে। কেন্দ্রটি দেশের মোট চাহিদার ১১ দশমিক পাঁচ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
সুনির্দিষ্ট কোন ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে ভারতীয়রা দেশ ছাড়ছেন তা নিয়ে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশন বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।



