ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই প্রভিশন বাধ্যতামূলক

ব্যাংকিং খাতে নতুন কাঠামো আনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুসরণ করে এখন থেকে কোনো ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে ‘প্রভিশন’ বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এ লক্ষ্যে প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি বা ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল)’ পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুসরণ করে এখন থেকে কোনো ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে ‘প্রভিশন’ বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এ লক্ষ্যে প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি বা ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল)’ পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করেছে। নতুন এই কাঠামো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) অনুযায়ী প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এটি ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক প্রতিবেদন এবং মূলধন ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে। একই সাথে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও আরো স্বচ্ছভাবে প্রতিফলিত হবে।

বর্তমান পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধতা : বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলো ‘ইনকারড লস’ পদ্ধতিতে প্রভিশন সংরক্ষণ করে। অর্থাৎ কোনো ঋণ খারাপ বা অনাদায়ী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরই তার বিপরীতে প্রভিশন রাখা হয়। ফলে অনেক সময় ব্যাংকগুলোকে এক সাথে বড় অঙ্কের প্রভিশন রাখতে হয়, যা তাদের মূলধনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ঋণ খারাপ হওয়ার পর প্রভিশন করতে হয়। এতে অনেক সময় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ পড়ে। নতুন পদ্ধতিতে সেই ঝুঁকি কমে আসবে। তিনি বলেন, এখন থেকে সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়েই আগাম প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। ফলে কোনো ঋণ শেষ পর্যন্ত খারাপ হয়ে গেলেও ব্যাংকগুলোকে একবারে বড় অঙ্কের প্রভিশনের চাপ নিতে হবে না।

আগাম ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর জোর : নতুন গাইড লাইনে বলা হয়েছে, শুধু অতীতের তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। এর মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই ব্যাংকগুলো সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির হিসাব করবে এবং সেই অনুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণ করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আগাম ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংকিং খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা আরো শক্তিশালী হবে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে।

ঋণ শ্রেণীকরণে ৩ ধাপ : নতুন নীতিমালা অনুযায়ী আইএফআরএস-৯ অনুসরণ করে ঋণকে তিনটি ধাপে শ্রেণীকরণ করা হবে। প্রথম ধাপে থাকবে স্বাভাবিক ঋণ। এসব ঋণের ক্ষেত্রে আগামী ১২ মাসে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব করে প্রভিশন নির্ধারণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে থাকবে এমন ঋণ, যেগুলোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঋণের ক্ষেত্রে পুরো ঋণের মেয়াদকালজুড়ে সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। তৃতীয় ধাপে থাকবে ‘ক্রেডিট ইমপেয়ার্ড’ বা ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ। অর্থাৎ যেসব ঋণ ইতোমধ্যে সমস্যাগ্রস্ত বা অনাদায়ী হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ঋণের ক্ষেত্রেও পুরো মেয়াদকালের সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব করে প্রভিশন রাখতে হবে।

সুদ আয়ের হিসাবেও পরিবর্তন : নতুন কাঠামোর আওতায় সুদ আয়ের হিসাব পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঋণের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সুদ আয়ের স্বীকৃতি দেয়া হবে।

এর ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আয় এবং ঝুঁকির চিত্র আর্থিক প্রতিবেদনে আরো বাস্তবসম্মতভাবে প্রতিফলিত হবে। অনেক সময় খারাপ ঋণের বিপরীতেও কাগজে-কলমে সুদ আয় দেখানো হয়- নতুন ব্যবস্থায় সেই সুযোগ কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মূলধন সমন্বয়ের জন্য সময় : বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন এই পদ্ধতি চালুর ফলে কিছু ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত মূলধনের চাপ তৈরি হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ব্যাংকগুলোকে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয়েছে। গাইড লাইন অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলেও ব্যাংকগুলোকে মূলধন সমন্বয়ের জন্য অতিরিক্ত পাঁচ বছর সময় দেয়া হবে। অর্থাৎ ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে। এ ছাড়া কোনো ব্যাংকের মূলধন কমে গেলে নির্দিষ্ট হারে তা পুনঃ সংযোজন করার সুযোগও রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মান বাস্তবায়নের পথ : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২০ সালে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) বাংলাদেশে আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। তবে এত দিন এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো পূর্ণাঙ্গ গাইড লাইন ছিল না। নতুন এই গাইড লাইন জারির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলো। ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ এই পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ দিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মোকাবেলায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আগাম ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রভিশন সংরক্ষণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আর্থিক ধাক্কা সামাল দিতে আরো সক্ষম হবে। তবে একই সাথে তারা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু নীতিমালা জারি করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই উদ্যোগ দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা এবং আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।