তেলের লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা

সীমা বেঁধে দেয়ায় বাড়ছে ভোগান্তি

শাহ আলম নূর
Printed Edition
রাজধানীতে জ্বালানি তেল সংগ্রহে পেট্টলপাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ : নয়া দিগন্ত
রাজধানীতে জ্বালানি তেল সংগ্রহে পেট্টলপাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ : নয়া দিগন্ত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সরকার তেল কেনার ওপর সীমা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে এতে অনেক চালক ও সাধারণ ভোক্তার ভোগান্তি আরো বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও এই লাইন এক কিলোমিটারেরও বেশি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। আবার অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা বোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। রাজধানীর আসাদগেট, কল্যাণপুর, তেজগাঁও, মতিঝিল, মহাখালী ও বিজয় সরণি এলাকার একাধিক পেট্রল পাম্পে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।

রাজধানীর রমনা ফিলিং স্টেশনে অকটেন নেয়ার জন্য প্রায় ৪০ মিনিট ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাইকার অপূর্ব বিশ্বাস। তিনি রাইড শেয়ারিং করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দীর্ঘ অপেক্ষা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তেল নিতে যদি দিনের অর্ধেক সময়ই পার হয়ে যায়, তাহলে বাকি সময়ের ভাড়া দিয়ে পোষাবে না।

অপূর্ব জানান, আগে দিনে এক বা দুইবার তেল নিলেই সারা দিন বাইক চালানো সম্ভব হতো। কিন্তু এখন সরকার একবারে দুই লিটার তেল নেয়ার সীমা নির্ধারণ করায় দিনে চার থেকে পাঁচবার পাম্পে যেতে হচ্ছে। এতে কাজের সময়ের বড় একটি অংশ লাইনে দাঁড়িয়ে কাটাতে হচ্ছে।

এদিকে মালিবাগের হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনের সামনে এক ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাইড শেয়ারিং চালক রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে দিনে দুইবার তেল নিলে সারা দিন কাজ করা যেত। এখন চার-পাঁচবার তেল নিতে হয়। ফলে প্রায় ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে আয় কমে যাচ্ছে।

আল আমিন নামে এক ব্যবসায়ী জানান, শুক্রবার রাতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পেট্রল পাননি। গতকাল সকালে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর মাত্র দুই লিটার অকটেন নিতে পেরেছেন। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ছোট পাম্প বন্ধ থাকায় বড় পাম্পগুলোতে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় লাইন এক কিলোমিটারের বেশি ছাড়িয়ে গেছে।

খালেক স্টেশনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বাইকার ইয়াছিন বলেন, সরকার বলছে দেশে তেলের কোনো সঙ্কট নেই। তাহলে তেল কেনার ওপর সীমা আরোপ করা হলো কেন- এই প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই ঘুরছে। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরো বাড়ছে। এদিকে আবার অনেকে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন। হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা জাওয়াদ আল জাফি বলেন, সীমা বেঁধে দেয়ায় মানুষ অতিরিক্ত তেল মজুদ করতে পারবে না। এতে সঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমবে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশন মালিক ও কর্মচারীরাও বলছেন, হঠাৎ অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পাম্পে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চাহিদা দেখা গেছে। ফলে দ্রুত মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

পরীবাগের একটি ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষক জাফর আহমেদ বলেন, সাধারণত ছুটির দিনে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ আসে না। কিন্তু গত কয়েক দিনে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তাদের মজুদ আগেই শেষ হয়ে গেছে। নতুন সরবরাহ এলে আবার বিক্রি শুরু করা যাবে। পাম্প কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু গ্রাহক আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নেয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে স্বল্প সময়েই পাম্পের মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।

এদিকে ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইনের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের অনেক জায়গায় লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দেখা গেছে। কিছু এলাকায় হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।

ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সড়কের স্বাভাবিক যান চলাচল বজায় রাখার পাশাপাশি এখন পাম্পকেন্দ্রিক যানজটও সামাল দিতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় আলাদা লাইন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যানবাহনে তেল নেয়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেল একবারে দুই লিটার, ব্যক্তিগত গাড়ি ১০ লিটার, এসইউভি বা মাইক্রোবাস ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত তেল নিতে পারবে। পিকআপ বা লোকাল বাসের জন্য ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস বা ট্রাকের জন্য ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শিগগিরই নতুন জাহাজে তেল এসে পৌঁছালে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

তবে মাঠপর্যায়ে সাধারণ চালক ও ভোক্তারা বলছেন, বাস্তবে তেল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় তাদের দৈনন্দিন জীবন ও আয়-রোজগারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। অনেক রাইড শেয়ারিং চালক ও পরিবহন চালক জানিয়েছেন, কাজের অর্ধেক সময় তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় তাদের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে এই পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে আতঙ্ক কমে গেলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে ফিলিং স্টেশনগুলোর এই অস্বাভাবিক চাপও কমে আসবে বলে তারা মনে করেন।

রাজশাহীতে পুলিশ পাহারায় তেল বিক্রি : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের সরবরাহে সাময়িক ঘাটতির কারণে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এক ফিলিং স্টেশনে পুলিশের উপস্থিতিতে তেল বিক্রি করতে দেখা গেছে।

শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহীর পবা উপজেলার বিমানবন্দরের সামনে অবস্থিত মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। তেলের মেশিনের ওপর সাদা কাগজে লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল- জ্বালানি সঙ্কটের কারণে মোটরসাইকেলকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকার তেল, মাহিন্দ্রা/ভুটভুটিকে ২০০ টাকা, প্রাইভেট কারকে ১০০০ টাকা এবং পিকআপকে ৩০০ টাকার তেল দেয়া হবে।

তবে সেখানে উপস্থিত অনেক চালক অভিযোগ করেন, পাম্পে তেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও কোনো যানবাহনকে তেল দেয়া হচ্ছিল না। এ নিয়ে একপর্যায়ে পাম্পে হট্টগোল শুরু হয়। ক্ষুব্ধ চালকরা চিৎকার করে বলেন, যদি তেল দেয়াই না হয়, তাহলে দড়ি বেঁধে পাম্প বন্ধ করে রাখলেই পারত। অযথা আমাদের হয়রানি করার দরকার কী? এ সময় কেউ একজন এয়ারপোর্ট থানায় ফোন করলে দ্রুত পুলিশের একটি টহল গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পরে পুলিশ পাম্পের ম্যানেজারের সাথে কথা বললে তেলের মেশিন চালু করা হয় এবং উপস্থিত যানবাহনগুলোকে তেল দেয়া শুরু হয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই পরে তেল বিক্রি করা হয়।

এদিকে রাজশাহী বিভাগজুড়ে পেট্রল ও অকটেনের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়ায় বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে বাইকারদের দীর্ঘ সারি দেখা দিয়েছে। চালকরা অভিযোগ করছেন, চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি ফিলিং স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়েছে। যেসব স্টেশনে তেল রয়েছে, সেগুলোতে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।