আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ২২ জন জেলা প্রশাসককে (ডিসি) বাধ্যতামূলক অবসর এবং ৩৩ জন জেলা প্রশাসককে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছিল অর্ন্তবর্তী সরকার। সে সময়কার সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল এসব ডিসির চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে। সম্প্রতি ওএসডি থাকা ৩৩ জেলা প্রশাসকের ২৫ বছর পূর্ণ হলেও তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে গড়িমসি করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে চাইলেও ভেতরে থাকা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এটি বাস্তবায়নে নানাভাবে সময়ক্ষেপণ করছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী দেশ-বিদেশে ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ নামে কুখ্যাতি পায়। বাস্তবে জালিয়াতি ও প্রতারণাপূর্ণ ওই নির্বাচনে মানুষকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি। ভোট গ্রহণের আগের রাতেই দলীয় কর্মী, পুলিশ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যালট বাক্স ভরে রাখেন। প্রহসনের ওই নির্বাচনের যাবতীয় খরচ কার্যত ছিল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং আত্মসাৎ।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ৮ আগস্ট রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিতর্কিত ওই নির্বাচনের বিষয়ে তদন্তে নামে। এরই অংশ হিসেবে বিতর্কিত জেলা প্রশাসকদের তালিকা চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তৎকালীন জেলা প্রশাসকদের সম্পর্কে প্রতিবেদন নেয়া হয়। অধিকাংশ সাবেক ডিসি অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে সহায়-সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দুদকের তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। আর্থিক অনিয়ম সম্পর্কে যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দুদকে জমা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ৫৪ জনকে ওএসডি করা হয়।
সে সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো: মোখলেস উর রহমান জানিয়েছিলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর যে নির্বাচন, সেটাকে আমরা কেউ বলি বিতর্কিত, কেউ বলি অগ্রহণযোগ্য, কেউ বলি দিনের ভোট রাতে ইত্যাদি। এসব জায়গায় যেসব রিটার্নিং কর্মকর্তা এই তিন সময়ের রিটার্নিং অফিসারদের সহযোগিতায় এই সরকার তিন মেয়াদে থাকার কারণে আজকে আমরা এ দুরবস্থায় পড়েছি। তারা (ওই সময়ের ডিসিরা) অনেক বড় নেগেটিভ ভূমিকা রেখেছিল। কোনো একজন ডিসিও বলেনি আমি প্রতিবাদ করব, আমি রিটার্নিং অফিসার থাকব না, আমি রিজাইন করলাম, কাজ করব না। আমরাই ইতোমধ্যে ৪৩ জনকে (ডিসি) ওএসডি করেছি। যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম তাদের ওএসডি করা হয়। আর চাকরির বয়স ২৫ বছরের বেশি হলে আমরা বাধ্যতামূলক অবসর দিচ্ছি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় রাতের ভোটের এসব জেলা প্রশাসকের চাকরির বয়স ২৫ বছর হলেই তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দিতে চায়; কিন্তু সরকারের ভেতরে থাকা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্নীতিবাজ-ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে রাতের ভোটের ডিসিরা পদোন্নতি ও প্রাইজ-পোস্টিং পেয়েছেন। হয়েছেন আর্থিকভাবে লাভবান। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ভোটারবিহীন নির্বাচন করায় সাবেক ডিসিরা দেশদ্রোহের অপরাধ করেছেন। তাদের চাকরি থেকে অপসারণ করে সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করা উচিত; কিন্তু সরকারের ভেতরে থাকা একটি সিন্ডিকেট এসব কর্মকর্তার কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত করছেন।
বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার তালিকায় যারা রয়েছেন তারা হলেন- পটুয়াখালীর রাতের ভোটের জেলা প্রশাসক মো: মতিউল ইসলাম চৌধুরী, পঞ্চগড়ের সাবেক ডিসি সাবিনা ইয়াসমিন, মেহেরপুর ও টাঙ্গাইলের সাবেক ডিসি মো: আতাউল গনি, পিরোজপুরের সাবেক ডিসি আবু আলী মো: সাজ্জাদ হোসেন, সিলেটের সাবেক ডিসি এম কাজী এমদাদুল ইসলাম, সাতক্ষীরার সাবেক ডিসি এস এম মোস্তফা কামাল, লক্ষ্মীপুরের সাবেক ডিসি অঞ্জন চন্দ্র পাল, কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি মোছা: সুলতানা পারভীন, কিশোরগঞ্জের সাবেক ডিসি মো: সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, খাগড়াছড়ির সাবেক ডিসি মো: শহিদুল ইসলাম, খুলনার সাবেক ডিসি মোহাম্মদ হেলাল হোসেন, মাগুড়ার সাবেক ডিসি মো: আলী আকবর, বান্দরবানের সাবেক ডিসি মো: দাউদুল ইসলাম, চাদপুরের সাবেক ডিসি মো: মাজেদুর রহমান খান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাবেক ডিসি এ জেড এম নুরুল হক, বরিশালের সাবেক ডিসি এস এম আজিয়র রহমান, ভোলার সাবেক ডিসি মো: মাসুদ আলম সিদ্দিক, চুয়াডাঙ্গার সাবেক ডিসি গোপাল চন্দ্র দাশ, বরগুনার সাবেক ডিসি কবীর মাহমুদ, দিনাজপুরের সাবেক ডিসি মো: মাহমুদুল আলম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাবেক ডিসি হায়াত-উদ-দৌলা খান, কুমিল্লার সাবেক ডিসি মো: আবুল ফজল মীর, নেত্রকোনার সাবেক ডিসি মঈন উল ইসলাম, ফেনীর সাবেক ডিসি মো: ওয়াহিদুজ্জামান, রাঙ্গামাটির সাবেক ডিসি এ কে এম মামুনুর রশিদ, রাজশাহীর সাবেক ডিসি এস এম আব্দুল কাদের, ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক ডিসি ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম, শরীয়তপুরের সাবেক ডিসি কাজী আবু তাহের, নওগাঁ ও ময়মনসিংহের সাবেক ডিসি মো: মিজানুর রহমান, সুনামগঞ্জের সাবেক ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, শেরপুরের সাবেক ডিসি আনার কলি মাহবুব, নরসিংদীর সাবেক ডিসি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, হবিগঞ্জের সাবেক ডিসি মাহমুদুল কবীর মুরাদ।
ওএসডির পরেও এখনো বহাল চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাবেক ডিসি এ জেড এম নুরুল হক : গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ওএসডি করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাবেক ডিসি এ জেড এম নুরুল হকে। এ সময় ওই কর্মকর্তা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। মন্ত্রণালয়টির উপদেষ্টা ছিলেন ড. আসিফ নজরুল। একই সাথে ৩৩ জন রাতের ভোটের ডিসিকে ওএসডি করার পর একমাত্র এই কর্মকর্তাকেই মন্ত্রণালয় থেকে অবমুক্ত করা হয়নি। এর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এই কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।



