বাড়তি ব্যয়ে মেট্রোরেলের ‘নদ্দা এয়ারপোর্ট’ রুটের কাজ পাচ্ছে জাপানিজ-ভারতীয় কোম্পানি

ডিপিপিতে ব্যয় ধরা ছিল ৪,৫৮৩ কোটি, এখন ১১,৫৯০ কোটি টাকা

Printed Edition

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভলেপমেন্ট প্রজেক্ট’ (লাইন-১) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ‘ঢাকার উত্তর নদ্দা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ৫.১৮ কিলোমিটার সড়কে মেট্রোরেলের মেইন লাইন ও স্টেশনের কাজ পেতে যাচ্ছে একটি জাপান ও ভারতীয় কনসোর্টিয়াম কোম্পানি। এ জন্য কোম্পানিকে অনুমোদিত মূল ডিপিপি থেকে ৩২ ভাগ বেশি অর্থ প্রদান করতে হবে। মূল ডিপিপিতে (ডেভলেপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপোজাল) এই অনুমোদিত ব্যয় নির্ধারিত ছিল চার হাজার ৫৮২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এখন এই ব্যয় ৩২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা করা হচ্ছে।

ব্যয় বাড়িয়ে এই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য আজ মঙ্গলবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সচিব ড. জিয়াউল হক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সম্মতিকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছেন।

জানা গেছে, এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা। বাকি ৩৯ হাজার ৪৫০ জাপানের জাইকার ঋণ হিসেবে প্রদান করবে। মূল প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, কমলাপুর স্টেশন থেকে এয়ারপোর্ট স্টেশন পর্যন্ত এয়ারপোর্ট রুট এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত পূর্বাচল রুট (অ্যালেভেটেড) সমন্বয় মোট ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) ব্যবস্থা নির্মাণ ও পরিচালনা করা। ১৬.২১ কিলোমিটার এয়ারপোর্ট রুটটি আন্ডারগ্রাউন্ড (মাটির নিচ দিয়ে) নির্মাণ করা হবে।

সূত্র জানায়, এই প্যাকেজের প্রধান কাজ হলো নদ্দা স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত সর্বমোট ৫.১৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতাল রুট ও স্টেশন অবকাঠামো নির্মাণ। এর মধ্যে অত্যাধুনিক ‘টানেল বোরিং মেশিন’ (ঞইগ) প্রযুক্তির সাহায্যে ৪.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জোড়া (উড়ঁনষব) পাতাল টানেল খোদাই করা হবে। যাত্রীদের সুবিধার্থে এই অংশে তৈরি হবে ৩টি বিশ্বমানের ভূগর্ভস্থ (টহফবৎমৎড়ঁহফ) স্টেশন :

১. বিমানবন্দর স্টেশন (দৈর্ঘ্য ৩৮০ মিটার)

২. বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩ স্টেশন (দৈর্ঘ্য ২৫০ মিটার)

৩. খিলক্ষেত স্টেশন (দৈর্ঘ্য ২৫০ মিটার) উত্থাপিত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, এমআরটি লাইন-১-এর মূল লক্ষ্য কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত মোট ৩১.২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর মধ্যে বিমানবন্দর রুটের ১৬.২১৫ কিলোমিটার অংশ সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচ দিয়ে নির্মিত হবে, যা ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করবে।

জানা গেছে, প্যাকেজটির জন্য শুরুতে প্রাক্কলিত দাফরিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮,১০৯.০৭ কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পর সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে জাপানি ও ভারতীয় কনসোর্টিয়াম ঘরংযরসধঃংঁ-ঞচখ-ঞড়ফধ ঔঠ (নিশিমাতসু-টাটা প্রজেক্ট লিমিটেড- টোডা জয়েন্ট ভেঞ্চার) প্রথমে ১২,৪৪৫.১৯ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) গাইডলাইন ও নিয়ম অনুসরণে দীর্ঘ দরকষাকষি করা হয়। সভার মাধ্যমে ২০টি ভিন্ন আইটেমের উদ্ধৃত মূল্য কমিয়ে দরদাতাকে চুক্তি মূল্যে সম্মত করানো সম্ভব হয়। এতে মূল্য দর থেকে প্রায় ১,৫১০ কোটি টাকা (১৩.৯৫%) সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। চূড়ান্তভাবে কর, ভ্যাট (১০%) ও কাস্টমস ডিউটিসহ মোট চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১১,৫৯০.৫৮ কোটি টাকা। যদিও এটি মূল দাফতরিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৩২.০৫% বেশি, তবে জাইকার ঋণচুক্তি ও আন্তর্জাতিক ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং নিয়মানুগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। অর্থায়ন ও সরকারের প্রস্তুতিপ্রকল্পটি যৌথভাবে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার এবং জাপানের জাইকা । শুরুতে ২০১৯ সালে অনুমোদিত ডিপিপিতে এ প্যাকেজের জন্য ৪,৫৮২.৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে কাজের পরিধি ও বিশ্ববাজারের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে ডিএমটিসিএল (উগঞঈখ) প্রকল্প সংশোধনের করে এ প্যাকেজের জন্য ১১,৫৯০.৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ডিএমটিসিএলের ৮১তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় এই ক্রয় প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়।

পরবর্তীতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সারসংক্ষেপ পর্যালোচনা করে এতে সম্মতি জানান। সরকারি নিয়ম অনুসারে ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ মানের ক্রয় প্রস্তাব হওয়ায় এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরের যানজট হ্রাস, যাতায়াতের সময় কমানো এবং জাতীয় জিডিপিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে প্রকল্পটিকে অত্যন্ত জরুরি বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভার সম্মতি পেলেই দ্রুত চুক্তিস্বাক্ষর শেষে এই গুরুত্বপূর্ণ অংশের ভৌত কাজ দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তবে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, তড়িগড়ি করে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য না পাঠিয়ে দরকষাকষি করে ব্যয় আরো কমানো সম্ভব ছিল। তবে জাইকার প্রকল্পে টেন্ডার এমনভাবে করা হয় যাতে জাপানিজ ছাড়া অন্য দেশে প্রতিষ্ঠান কেম্পানির জন্য কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।