পুঁজিবাজারে দীর্ঘ দিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন করে আইপিও কার্যক্রমে গতি ফেরাতে ২০২৫ সালে জনস্বার্থে পাবলিক ইস্যু বিধিমালায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধিমালার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে শেয়ারের দাম নির্ধারণে ভবিষ্যৎ মুনাফা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনাকে একটি স্বতন্ত্র ও কার্যকর উপাদান হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু অতীত আয় বা বিদ্যমান সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আইপিও কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্তির আগ্রহ হারিয়েছে, আবার বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আইপিও নিয়ে আস্থার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ইস্যু ম্যানেজার ও উদ্যোক্তাদের অভিযোগ ছিল, বিদ্যমান মূল্যায়ন কাঠামো বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এতে প্রকৃত সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের নতুন বিধিমালা তৈরি করা হয়, যেখানে বাজারভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সালের বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল আগের সময়ের কিছু বিতর্কিত আইপিও অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে। সে সময় অতিমূল্যায়ন ও কারসাজির অভিযোগ ঠেকাতে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। ওই বিধি অনুযায়ী কোনো কোম্পানি প্রিমিয়ামে শেয়ার ছাড়তে চাইলে তাকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যেতে হতো এবং সেখানে শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা হতো নিট সম্পদ মূল্য ও আয়ভিত্তিক পদ্ধতির গড় হিসেবে। এরপর দরদাতারা ওই ন্যায্য মূল্যের সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২ গুণ পর্যন্ত দর দিতে পারতেন। ফলে যেসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও বর্তমান সম্পদ বা আয় তুলনামূলক কম ছিল, তারা প্রকৃত বাজারমূল্য থেকে বঞ্চিত হতো।
এ দিকে ২০২৫ সালের সংশোধিত বিধিমালায় এই কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে ভবিষ্যৎ মুনাফাকে শেয়ারমূল্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রে একটি কোম্পানির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়, নগদ প্রবাহ ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ পরিকল্পনা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিম আলমগীর বলেন, নতুন বিধিমালা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং এতে কোম্পানির ভবিষ্যৎ পারফরম্যান্স বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, কোনো একটি সাধারণ কোম্পানি যেখানে তার নিট সম্পদ মূল্যের সমান দামে শেয়ার ছাড়তে রাজি হতে পারে, সেখানে একটি উচ্চ সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান তার প্রতিযোগীদের তুলনায় বহুগুণ বেশি উৎপাদনশীল হওয়ায় অনেক বেশি দামে শেয়ার ছাড়তে চাওয়াই স্বাভাবিক।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় নতুন বিধিমালায় ইন্ডিকেটিভ প্রাইস নির্ধারণের প্রক্রিয়াতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইস্যু ম্যানেজার ও কোম্পানিকে যৌথভাবে রোডশোর মাধ্যমে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে চাহিদা ও মূল্যায়ন সংগ্রহ করতে হবে। এই ইন্ডিকেটিভ প্রাইস নির্ধারণে কমপক্ষে ৪০ জন যোগ্য বিনিয়োগকারীর মূল্যায়ন মতামত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০ জন পোর্টফোলিও ম্যানেজার, ১০ জন স্টক ডিলার এবং ১০ জন অ্যাসেট ম্যানেজার থাকতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষায়, এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো একক গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে মুক্ত রাখা।
বিএসইসির মুখপাত্র মো: আবুল কালাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০২৫ সালের বিধিমালা সম্পূর্ণ বাজারমুখী এবং এখানে বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে শেয়ারের দাম বাস্তবতার কাছাকাছি থাকে। তবে কয়েকজন ইস্যু ম্যানেজার জানিয়েছেন, ৪০ জন যোগ্য বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে মানসম্মত মূল্যায়ন মতামত সংগ্রহ করা একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বিধিমালায় শেয়ারমূল্য নির্ধারণে অন্তত চারটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেগুলো ভবিষ্যৎ আয় ও নগদ প্রবাহকে বিবেচনায় নেয়। এর মধ্যে রয়েছে ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো এবং ডিভিডেন্ড ডিসকাউন্ট মডেলের মতো পদ্ধতি। এসব পদ্ধতিতে একটি কোম্পানির ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ বা লভ্যাংশকে বর্তমান মূল্যে রূপান্তর করে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, নতুন বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতিগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে প্রকৃত মূল্য আবিষ্কারে সহায়ক হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বিধিমেলায় মূল্য বিকৃতির ঝুঁকি কমাতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য লক-ইন সময় চালু করা হয়েছে, যা ২০১৫ সালের বিধিমালায় ছিল না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক ৯০ দিন লক-ইনে থাকবে। অবশিষ্ট অর্ধেকের একটি অংশ ১২০ দিন এবং বাকিটুকু ১৮০ দিন পর সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রিযোগ্য হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক-ইন ব্যবস্থা প্রাথমিক লেনদেনের সময় কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি ও হঠাৎ দরপতনের ঝুঁকি কমাবে।
কারসাজি ও যোগসাজশ ঠেকাতে ২০২৫ সালের বিধিমালায় কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এতে ‘কার্টেল বা নীরব যোগসাজশ’-এর সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়েছে এবং একই দামে দর দেয়া, একই সময়ে দর জমা দেয়া বা ধারাবাহিকভাবে কাট-অফ প্রাইস প্রভাবিত করার মতো আচরণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হয় বিএসইসি দর বাতিল, ভবিষ্যৎ আইপিওতে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা, যোগ্য বিনিয়োগকারী মর্যাদা বাতিল কিংবা ইস্যু ম্যানেজারের লাইসেন্স স্থগিতসহ কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের বিধিমালা থেকে ২০২৫ সালের বিধিমালায় উত্তরণ বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আইপিও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ভবিষ্যৎ মুনাফা, বহুমাত্রিক মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়ায় এই বিধিমালা বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে এবং প্রকৃত সম্ভাবনাময় কোম্পানির তালিকাভুক্তির পথ সুগম হবে বলে আশা করছেন।



