সামিরার কষ্টের দিনগুলো

Printed Edition
সামিরার কষ্টের দিনগুলো
সামিরার কষ্টের দিনগুলো

তমসুর হোসেন

সামিরার কথা ভাবলে খুব কষ্ট হয়। চার বছরের কম সময় ও পৃথিবীতে বেঁচে ছিল। এই সময়ে এমন কোনো দিন আসেনি যেদিন সে সুস্থভাবে শ্বাস নিয়েছে। প্রতিদিন সে একটা না একটা রোগের কবলে পড়েছে।

জন্মের পর সে হেপাটাইটিস-বি এ আক্রান্ত হয়। এ রোগে তার অনেক দিন কাটে হাসপাতালের শয্যায়। বাবা তার খোঁজখবর নিতে পারত না। গার্মেন্টে কাজ করার কারণে বাবা খুব কম ছুটি পেত। তার বেতন ছিল খুবই কম। সামান্য বেতনে সংসার চালানো তার পক্ষে খুব কষ্টকর হতো। তার ওপর সামিরার চিকিৎসার পেছনে সে অনেক ঋণ করে ফেলেছে। দিন-রাত পরিশ্রম করে সে ঋণ শোধ করতে পারছে না। সামিরাকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। মেয়েকে সে ভালো মাদরাসায় পড়াবে। তাকে হাফেজা বানাবে। হাফেজা হওয়ার পর তাকে আলেমা পড়াবে। মেয়ে যাতে দ্বীনি এলেম প্রচার করতে পারে তেমন শিক্ষা দেবে সে। মেয়ে অসুস্থ হওয়ায় বাবার সব স্বপ্ন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। যে মেয়ের জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা তো সম্ভব নয়।

আল্লাহর কাছে দিন-রাত প্রার্থনা করে বাবা। ‘হে মাবুদ! তুমি আমার সামিরাকে সুস্থ করে দাও। ওকে নিয়ে কত আশা করেছি। ইচ্ছে ছিল ওকে তোমার দ্বীনের খাদেমা বানাব। কুরআনের পাখি বানাব। আমার সে বাসনা তুমিই পূরণ করতে পার আমার মাওলা পরোয়ার। আমি যে গরিব। আমার উপার্জন খুবই কম। কী করে আমি সামিরার চিকিৎসা করাব। মাবুদ দয়াময়, তুমি আমার অভাগী মেয়েকে সুস্থ করে দাও।’ রুগ্ন মেয়ের জন্য রাত-দিন প্রার্থনা করে বাবা। মাঝে মধ্যে মোবাইল করে মেয়ের খবর নেয় আবদুল হামিদ। দুর্বল কণ্ঠে বাবাকে সান্ত্বনা দেয় বুদ্ধিমতি সামিরা। বাবাকে সে বলে- ‘বাবা। আমি ভালো আছি। তুমি কোনো চিন্তা কর না।’

‘চিন্তা না করে কী করব আমার ছোট্ট মা। দিন-রাত যে তোমারই চিন্তা করি।’ ‘চিন্তা করে কী হবে বাবা! আমার নসিবে যা আছে তাই হবে।’ ‘তোমার এই অবস্থা আমি কেমন করে সহ্য করব আমার সোনা পাখি।’ ‘অমন করে বললে মাবুদ নারাজ হবে বাবা। ওনার কাছে যা ভালো তা মেনে নিতে হবে।’

বাবাকে অনেক প্রবোধ দেয় সামিরা। ওর কথা শুনে বাবা অবাক হয়। অতটুকু মেয়ে। তার মধ্যে ধৈর্য ও খোদাপুরস্তির আভাস দেখে মুগ্ধ হয় সে। ওর অন্তরে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে নিখাঁদ খোদাপ্রেম।

মেয়ের কষ্টে ভেঙে পড়লেও আবদুল হামিদ মাবুদের দরবারে হৃদয়ের অতল থেকে শোকরিয়া জ্ঞাপন করে। সে ভাবে মাবুদ সামিরাকে দুনিয়ায় রাখার জন্য সৃষ্টি করেননি। অনন্ত জীবনের কঠিন মুছিবতে বাবা-মাকে ত্বরিয়ে নেয়ার জন্য বুঝি তার আগমন। সে দোয়া করে- ‘হে মাওলা, সামিরাকে আমাদের নাজাতের জন্য কবুল করো।’ বিছানায় শুয়ে শুয়ে করুণ সুরে সামিরা আল্লাহ ও রাসূলের গুণগান করে। তার ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে দয়াল নবীর কবর জিয়ারত করবে। মক্কা ও মদিনার প্রান্তরে বিচরণ করে আল্লাহর নিদর্শন দেখবে। কিন্তু তার পক্ষে তো এই দুস্তর পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। মনের কষ্টে আহত পাখির মতো সে গেয়ে ওঠে-

‘আমি যে পথ চিনি না/ কেমনে যাব মদিনা

দয়া কর দয়াল আল্লাহ/ পুরাও মনের বাসনা...

বিছানায় শুয়ে সামিরা অনেক চিন্তা করে। তার সমবয়সী বাচ্চারা প্রতিদিন মাঠে খেলতে যায়। তারা খেলাধুলা করে কত আনন্দ লাভ করে। বাবা-মায়ের সাথে কতখানে বেড়াতে যায় তারা। মেলা বাড়ি থেকে তারা কত জিনিস কিনে আনে। কিন্তু সামিরা কোথাও যেতে পারে না। এক টুকুতেই সে হাঁফিয়ে ওঠে। কোথাও বেড়াতে গেলে গায়ে জ্বর আসে। ওর পেছনে খরচ করে মায়ের হাতে কোনো টাকা থাকে না। ও বায়না করলে মায়ের মন খারাপ হয়ে যায়। মা তখন আড়ালে বসে কান্না করে। সামিরা মায়ের চোখে পানি দেখতে পারে না।

ওর যখন থেকে বোধ হয়েছে মায়ের মুখে একটু হাসি দেখতে পায়নি। মেঘলা আকাশের মতো মায়ের মন মলিন হয়ে থাকে। সামিরা বুঝতে পারে ওর কারণেই মায়ের এত কষ্ট। বাবা-মায়ের জন্য সুখ নিয়ে আসতে পারেনি সে। অসুস্থ শরীরে হেঁটে হেঁটে সে মায়ের কাছে যায়। মায়ের চোখের পানি মুছে দেয় সে কম্পিত হাতে। বিবর্ণ আঙুল দিয়ে মাকে আদর করে। মা তখন তাকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মাকে সান্ত্বনা দেয় সামিরা- ‘মা তুমি একটুও কাঁদবে না। বায়না করে তোমাকে কষ্ট দেবো না আমি।’ ‘আমার কাছে একটি টাকাও যে নেই মা। যা ছিল ওষুধ কিনে ফুরিয়ে গেছে।’ ‘আর কেঁদো না সোনা মা। তোমার হাসি খেলনার চেয়ে দামি।’ ‘তোমার বাবাকে বলব সুন্দর খেলনা আনবে তোমার জন্য।’ ‘লাগবে না মা। অনেক খেলনা আছে আমার। স্বপ্নে জান্নাতের বাচ্চারা ওগুলো নিয়ে আসে।’ ‘কী বলছ এসব। এমন করে বলতে নেই।’ ‘না বললে জানবে কেমন করে। ওরা আমাকে অচিরেই এখান থেকে নিয়ে যাবে।’ ‘কোথায় নিয়ে যাবে মামনি।’ ‘আমার ওপারের বাড়িতে। এপারে তো সুখ নেই।’ ‘তুমি কী আমাকে একা ফেলে যাবে? তোমাকে ছাড়া কেমন করে থাকব?’ ‘আমি তো সব সময় তোমাকে দেখতে আসব। আমার তো পিঠে পাখা হবে তখন। আর আমার অসুখ একটুও থাকবে না।’ মাকে অনেক কথা শোনায় সামিরা। জানো মা, একদিন আমি নূরের ঘোড়ায় চড়ে অনেক দূরে চলে গেছি। একটি পাহাড়ি নদীর পাড় ধরে ঘোড়াটা চলতে থাকে চলতে থাকে। পাহাড়ের উঁচু টিলায় রুপার গাছে হীরের ফুল ফুটেছে। সে ফুলের মধু খেয়ে মিষ্টি সুরে গান গায় সবুজ রঙের অনেক পাখি। সেখানে চিরহরিৎ গাছে ঝুলে আছে কত রকমের সুবাসিত ফল। ঘোড়াটা কোথায় দাঁড়ায় না আপনমনে হেলেদুলে চলতে থাকে। একটি মনোরম হ্রদের কাছে এসে ঘোড়াটা আমাকে নামিয়ে দেয়। সেখানে ঘাসের জাজিমে নেচে নেচে খেলা করছে ছোট ছোট রূপবান শিশুরা। তারা আমাকে পেয়ে খুবই আনন্দিত হয়। ওদের একজন সবাইকে কাছে ডেকে বলে- শোনো বন্ধুরা, এই হলো আমাদের নতুন অতিথি। আর কিছু দিনের মধ্যে পৃথিবী ছেড়ে ও আমাদের মধ্যে চলে আসবে। তোমরা সবাই ওর জন্য দোয়া করো।’ অনেক আনন্দ আর মজাদার সব জিনিস খাওয়া হয় সেখানে।

এমন ধরনের গল্প সামিরা প্রায় মাকে শোনায়। শুনে শুনে মা ওর জন্য প্রাণভরে প্রার্থনা করে। ও যদি এই যন্ত্রণার দুনিয়া থেকে পরলোকের ভুবনে চলে যায় মাবুদ যেন ওকে অনন্ত সুখের জান্নাতে ঠাঁই দেয়। ওর এত দুঃখ আর প্রাণে সহ্য হয় না।

একদিন সকালবেলা মাকে ডেকে সামিরা বলে, ‘মা আজ দুপুরে বাবা আসবে। আমার মন বলছে বাবা আসার পর আমি দুনিয়া থেকে চলে যাবো। মা তুমি সকালে রান্না করো। সবাইকে খেতে দাও। তুমিও খেয়ে নাও। বাবা এলে বাবাকেও জলদি খেতে দিও। আমার হাতে বেশি সময় নেই। তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো। বাবা খুব জলদি এসে যাবে। একটুও কান্না করবে না তুমি। কান্না করলে সময় নষ্ট হবে। আমি যা বলছি তেমন করে কাজ করো। কাউকে কিছু বলবে না।’ সামিরার মনে একটু কষ্ট নেই। সে দেখতে পাচ্ছে জান্নাতের চপল কিশোরেরা সোনার বাহন নিয়ে তার বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছে। তার বাড়িটা জান্নাতের আতরের সুবাসে ভরপুর হয়ে গেছে। গাছের পাতায় হাওয়ার নহবত বাজছে। মেঘের শরীরে নৃত্য করছে বিদ্যুতের নরম লতা। সামিরার মন আজ বড়ই উতলা হয়ে গেছে। এই বিষাদক্লিষ্ট দুনিয়া থেকে আজ তার সুখের অনন্তলোকে চলে যাওয়ার দিন।

বাবা এসে গেছে। তার কথা অনুযায়ী মা সব কাজ করেছে। সবাইকে শয্যার কাছে আসতে বলল সামিরা। বাবাকে বলল, বাবা তুমি কুরআন তিলাওয়াত করো। মাকে বলল, মা তুমি দোয়া পড়তে থাক। সবাইকে মনে মনে তসবি পড়তে বলল সে। সামিরাও অনুচ্চ কণ্ঠে কালেমা তাওহিদ পাঠ করতে লাগল। এমন এক পবিত্র পরিবেশে সামিরার আত্মা তার রুগ্ন দেহ থেকে মুক্ত হয়ে মহাশূন্যের বিস্তীর্ণ পারাবারে হারিয়ে গেল।