কারিকুলামে যুক্ত হচ্ছে ক্রীড়া মাদরাসায় আসছে বাণিজ্য

শিক্ষাখাত সংস্কারে দুই ধাপের পরিকল্পনা

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনে ৩০০ জনের কমিটি এনসিটিবির

শিক্ষা কারিকুলামকে নতুনভাবে সাজাতে কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার। শিক্ষাস্তরের প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা এমনকি মাদরাসার সিলেবাসেও নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার জাতীয় শিক্ষাক্রম কমিটির (এনসিসি) সভায় শিক্ষাক্রমে নতুন বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অবশ্য এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন শ্রেণীতে ক্রীড়া বিষয়টিকে যুক্ত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশ্ববাণিজ্য ও যুগের চাহিদার আলোকে মাদরাসা শিক্ষায় নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে মূলত দুই ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই শিক্ষা কারিকুলাম নতুনভাবে সাজাতে কাজ শুরু করতে চায় বিএনপি সরকার। এর মধ্যে স্বল্প মেয়াদে একটি পরিকল্পনায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই পাঠ্যক্রমে কিছু বিষয় পরিমার্জন ও সংশোধন আনতে কাজ শুরু হয়েছে। আর দীর্ঘ মেয়াদে অর্থাৎ ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুনভাবে কারিকুলাম প্রণয়নের জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে। আর এই দুই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েই প্রায় তিন শ’ জনের একটি বৃহৎ পরিমার্জন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সূত্র জানায় গত ৩০ মার্চ এনসিটিবির বিগত দিনে কারিকুলাম পরিমার্জনে কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন ২৭৫ জনের একটি তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করেছে। আগামী সপ্তাহেই এই তালিকা চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের পরে কাজ শুরু করবে পাঠ্যপ্স্তুক পরিমার্জন কমিটি।

এ দিকে এনসিটিবি সূত্র জানায়, সরকারের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রাথমিকের চতুর্থ শ্রেণী থেকেই ক্রীড়াকে একটি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে কারিকুলামে যুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণীতে কোন কোন খেলার কোন কোন বিষয় যুক্ত করা যায় তা নিয়েও কাজ করছে ক্রীড়া সেক্টরের লোকজন। অপর দিকে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সম্ভব না হলেও ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে মাদরাসায় দাখিল পর্যায় থেকে মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগের সাথে বাণিজ্য বিভাগ চালু করার কথা চিন্তা করা হচ্ছে। আর এ বিষয়ে গতকাল জাতীয় শিক্ষাক্রম কমিটির (এনসিসি) সভায় জানানো হয়েছে মাদরাসায় বাণিজ্য বিভাগ চালু হলে চারটি বিষয় যুক্ত করা হতে পারে। বিষয়গুলো হলো- অ্যাকাউন্টিং, ফিন্যান্স, মার্কেটিং ও ম্যানেজমেন্ট।

অভিভাবকদের অভিযোগ আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে বিতর্কিত এবং ভিনদেশী কারিকুলাম আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর পতিত আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া যাওয়ার পর সেই কারিকুলাম বাতিল করা হয়েছে। তবে শিক্ষা সেক্টরের তখন সাময়িক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পূর্বের (২০১২ সালের) কারিকুলামে ফিরে গিয়ে এবং কিছু মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন এনে কম সময়ের মধ্যেই পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ শেষ করে পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়। অবশ্য তখন থেকেই শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানিয়েছিলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবং নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্বভার গ্রহণের পরেই নতুন করে শিক্ষা কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এনে নিজেদের দৃভিঙ্গির আলোকেই কারিকুলাম ও শিক্ষা পরিকল্পনা সাজাবেন।

এখন নতুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণের পর তিনি নিজেই কারিকুলামে আমূল পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের শিক্ষা কারিকুলামে হয়তো সবকিছু এখনই পরিবর্তন করা যাবে না। তবে কিছু বিষয়ে পরিমার্জনের জন্য তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। একই সাথে পরের বছরে অর্থাৎ ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে সামগ্রিকভাবে পুরো শিক্ষা কারিকুলামে তথ্যপ্রযুক্তনির্ভর এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান বাড়ানোর বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দেবেন বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) প্রফেসর ড. এ কে এম মাসুদুল হক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, বুধবার মন্ত্রণালয়ে এনসিসির সভা হয়েছে। সভায় কারিকুলামে কিছু বিষয় যুক্ত বা পরিমার্জন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বটে তবে এখানো কোনো বিষয়ই চূড়ান্ত হয়নি। সভায় মাদরাসায় বাণিজ্য বিভাগ চালু করে সেখানে ব্যবসা বাণিজ্যের চারটি বিষয় যুক্ত করার আলোচনা হলেও পরে এগুলো আরো যাচাই-বাছাই করার জন্য বলা হয়েছে। কোনো কিছুই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এনসিটিবির অন্য একটি সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে এখনো অনেক শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞ ছিলেন যারা সরকারে টাকা নিয়েছেন কিন্তু কারিকুলাম পরিমার্জনে কোনো কাজ করেননি। এবার সেই শিক্ষকদের পরিমার্জন কমিটির তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।