আজ রোববার থেকে অনলাইনে মিলবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের পিডিএফ কপি। সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে পাঠ্যবইয়ের অনলাইন ভার্সন কপি। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে নতুন কলেবরে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের ইতিবৃত্ত। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা উপস্থিত থেকে আজ নতুন পাঠ্যবইয়ের এই অনলাইন ভার্সনের উদ্বোধন করবেন। এনসিটিবি ওয়েবসাইটে একযোগে বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের ৬৪৭টি পাঠ্যবই উন্মুক্ত করা হবে। এর ফলে নতুন বছর শুরু হওয়ার আগেই পাঠ্যবই পড়ার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা। এনসিটিবির ওয়েবসাইট িি.িহপঃন.মড়া.নফ-এ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণীর বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের ৬৪৭টি পাঠ্যপুস্তকের অনলাইন ভার্সন পাওয়া যাবে।
এ দিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো এবার সরাসরি জায়গা পাচ্ছে পাঠ্যবইয়ে। দীর্ঘদিন বিতর্ক, সমালোচনা ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে এনসিটিবি। একই সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার পতন ও ফ্যাসিবাদের অবসানের ঘটনাপ্রবাহ। এর পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ের ভাষা, বিষয়বস্তুর ভারসাম্য ও গুণগতমান উন্নত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের পাঠ্যবইয়ের অনেক বিষয় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি। সেগুলো মাথায় রেখেই এবার উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশে বেশ কিছু বইয়ের কনটেন্টে বড় ধরনের পরিবর্তন-পরিমার্জন করা হয়েছে। এনসিটিবির পাঠ্যবই সম্পাদনার সাথে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ জানান, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সুপারিশে মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণীর বইয়ের কনটেন্টে সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং পৌরনীতি বইয়ে দেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলা ও ইংরেজি পাঠ্যবইয়েও পরিমার্জন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বইগুলো প্রকাশ হয়েছে, তবে তা এখনো অনলাইনে আপলোড হয়নি। আজ ২৮ ডিসেম্বর অনলাইনে বইয়ের পিডিএফ কপি আপলোড হওয়ার কথা রয়েছে। এনসিটিবির সূত্রগুলো বলছে, এবার পাঠ্যবইয়ে বেশ গুরুত্বের সাথে গত বছরের ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। সেই সাথে স্থান পেয়েছে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন ও ফ্যাসিবাদের অবসানের তথ্য। এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের কনটেন্ট কমবেশি আকারে রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার পতন ও ফ্যাসিবাদের অবসানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত অষ্টম শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর তৃতীয় অধ্যায়টির নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’। আগে এ অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’। নতুন শিরোনামে এ অধ্যায়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণ-অভ্যুত্থান পাঠে রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং হাসিনার পতন ও ফ্যাসিবাদ অবসানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে এ অধ্যায়ে শুধু পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছিল। অষ্টম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য কণিকা বই থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্য সব শ্রেণীর বইয়ের কনটেন্টে ছোটখাটো পরিবর্তন হচ্ছে।
নবম-দশম শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান’ অধ্যায়ে ২০০৮ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন; পরে ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা, বিরোধী দলমতের মানুষের ওপর দমন-নিপীড়ন, দুর্নীতির প্রসার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করার মাধ্যমে দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় হাসিনার বেপরোয়া হয়ে ওঠা; ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক সঙ্কট। পরে তরুণসমাজ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনতা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। এভাবে ২০১৪-এর ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সাথে প্রতারণা এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ প্রণয়ন করে আওয়ামী লীগ। জনগণ তাদের চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার এ নীল-নকশা প্রত্যাখ্যান করে।
একই সাথে পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবের বাকশালি ও এরশাদের স্বৈরশাসনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়। রাজনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হয়। এ সময় দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসে বিচারপতি আবদুস সাত্তার দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ। তার সময়ে যে ক’টি নির্বাচন হয়, তার সবগুলোই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বছরের শুরুতেই সব শিক্ষার্থী হাতে পাবে পাঠ্যবই। তবে পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, প্রাথমিকের শতভাগ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিকের বাকি বইগুলোও দ্রুতই পৌঁছে দেয়ার কাজ চলমান রয়েছে।



