- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে জেআইসি সেল (আয়নাঘর) ও অন্যান্য গোপন কারাগারে রাজনৈতিক বিরোধী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সরকারবিরোধী ব্যক্তিদের গুম, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আগামীকাল মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত।
প্রসিকিউশনের দাবি, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে তার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে ডিজিএফআই (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর) ও সিটিআইবি (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো)-কে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার সরাসরি নির্দেশ ও সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর তত্ত্বাবধানে ডিজিএফআই ও সিটিআইবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কাঠামোগত, ব্যাপকমাত্রার এবং লক্ষ্যভিত্তিক গুম, অপহরণ ও নির্যাতন পরিচালনা করেছেন। গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ তারিখ নির্ধারণ করেন। বাকি সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি জেআইসি সেলে সরকারবিরোধী ঘরানার লোকদের তুলে নিয়ে গুম-নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা তুলে ধরেন। একই সাথে ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুম হওয়া ২৬ জনের বীভৎসতা সামনে আনেন। এসব ঘটনায় পাঁচটি অভিযোগ এনে এ মামলায় ১৩ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন বা বিচার শুরুর আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর। পরে স্টেট ডিফেন্স ও গ্রেফতার তিন আসামির পক্ষে সময় চাইলে শুনানির জন্য ৯ ডিসেম্বর দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। উপস্থিত তিন আসামির পক্ষে আবেদন করেন আজিজুর রহমান দুলু।
শেখ হাসিনার উচ্চপদস্থ দায় ও যৌথ অপরাধ সংঘটন : প্রসিকিউশনের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী হিসেবে তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ডিজিএফআই ও সিটিআইবিকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। তিনি তার সামরিক ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী ও ক্ষমতার জন্য হুমকি বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। ডিজিএফআই ও সিটিআইবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার সরাসরি বা পরোক্ষ নির্দেশে গুম, অপহরণ ও নির্যাতন পরিচালনা করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিজিএফআই-এর ডিজি (মহাপরিচালক) ও সিটিআইবির পরিচালকরা তাদের দায়িত্ব গ্রহণের সময় পূর্ববর্তী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের তালিকা ও অবস্থা বুঝে নিতেন এবং পদত্যাগের সময় পরবর্তী কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করতেন। ফলে, প্রতিটি গুমের শিকার ব্যক্তির সাথে তৎকালীন ডিজি ও পরিচালকরা সরাসরি জড়িত ছিলেন।
অভিযোগে আরো বলা হয়, শেখ হাসিনা তার উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর মাধ্যমে ডিজিএফআই-এর তৎকালীন ডিজি মো: আকবর হোসেন, মো: সাইফুল আবেদিন, মো: সাইফুল আলম, আহম্মেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, হামিদুল হক এবং সিটিআইবির পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদ-উল ইসলাম, শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, কবির আহম্মদ, মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দীকি, আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দীকি ও মখসুরুল হককে ব্যবহার করে গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। এই কর্মকর্তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পরামর্শে ব্যক্তি চিহ্নিত করে অপহরণ, গুম ও নির্যাতন পরিচালনা করেছেন। আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। অনেককে হত্যা করে নদী-নালা বা খাল-বিলে ফেলে দেয়া হতো, আবার অনেককে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেয়া হতো।
গুমের কাঠামো ও পদ্ধতি : ডিজিএফআই ও সিটিআইবির ভূমিকা
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিজিএফআই-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রথমে অপহরণ করে জেআইসি সেল (আয়নাঘর) বা অন্যান্য গোপন কারাগারে আটকে রাখা হতো। সেখানে তাদের চোখ বেঁধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টার (এনএমসি) ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) গুমের শিকার ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হতো।
গুমের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং এবং বিভিন্ন সম্মানসূচক পদক প্রদানের মাধ্যমে প্রণোদনা দেয়া হতো। শেখ হাসিনা সরকার গুমের অভিযোগ অস্বীকার করে বলতেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যেও অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়’। তবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার অভিযোগ তুললেও কোনো তদন্ত বা স্বচ্ছতা দেখা যায়নি।
গুমের শিকার ব্যক্তিরা : তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শেখ মো: সরওয়ার হোসেনের দায়িত্বকালে (১৭ আগস্ট ২০১৮ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০) জেআইসি সেলে গুমের শিকার হয়েছিলেন:
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী (২২ আগস্ট ২০১৬ থেকে ৬ আগস্ট ২০২৪); ম. মারুফ জামান (৪ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে ১৫ মার্চ ২০১৯); ইকবাল চৌধুরী (৭ মে ২০১৮ থেকে ২৫ এপ্রিল ২০১৯); লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান (৮ আগস্ট ২০১৮ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০); সৈয়দ আকিদুল আলী (১৩ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯); মো: খোরশেদ আলম পাটোয়ারী (১৩ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯); মো: আশরাফ আলী (২৭ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ১৬ অক্টোবর ২০২১); মো: নুরুল ইসলাম (নজরুল) (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০); মো: বাবুল মিয়া (৮ মার্চ ২০১৯ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০); মাইকেল চাকমা (৯ এপ্রিল ২০১৯ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪); রেজওয়ান মাহমুদ অনিক (৪ নভেম্বর ২০১৯ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। এদের মধ্যে অনেককে দীর্ঘদিন আটকে রেখে পরে বিভিন্নভাবে মুক্তি দেয়া হয়, আবার অনেককে হত্যা করে ফেলে দেয়া হয়।
মাদকবিরোধী যুদ্ধ ও গুমের অপব্যবহার : ২০১৮ সালের মে মাসে শেখ হাসিনা ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন, যার নেতৃত্ব দেয় র্যাব। ওই বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪৬৬টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটায়, যার অধিকাংশই রাজনৈতিক কর্মী ও সরকারবিরোধী ব্যক্তিদের আড়ালে মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা করা হয়। অধিকার ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসব হত্যাকাণ্ডের আগে ভিকটিমদের একদিন থেকে এক মাস পর্যন্ত গুম করে রাখা হতো। শুধু ২০১৮ সালেই অন্তত ৯৮ জনকে গুম করা হয়। এর আগে, ২৩ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। পলাতক আসামিদের পক্ষে পরে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেয়া হয়। শেখ হাসিনার আইনজীবী হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেডআই খান পান্না স্বেচ্ছায় লড়তে চাইলেও শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে তা প্রত্যাহার করলে মো: আমির হোসেনকে নিয়োগ দেয়া হয়।
গত ২২ অক্টোবর সেনা হেফাজতে থাকা তিন সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়। পলাতক আসামিদের হাজিরের জন্য সাত দিনের মধ্যে দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়।
৫ আগস্ট পরবর্তী সরকার গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গুম কমিশন গঠন করে। ইতোমধ্যে তারা দুইটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিজিএফআই কর্তৃক গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৬ জনের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রসিকিউশন অভিযোগ করেছে, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর ৩(২)(এ), (এফ), (জি), (এইচ) এবং ৪(১), ৪(২), ৪(৩) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন, যা উক্ত আইনের ২০(২) এবং ২০অ ধারায় শাস্তিযোগ্য। আদালত এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অভিযোগ গঠনের শুনানি উপলক্ষে গুমের পর মুক্তি পাওয়া অনেকে সে দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আব্দুল্লাহিল আমান আযমীও ছিলেন। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে তিনি যখন ট্রাইব্যুনাল কক্ষ ছেড়ে যান, তখন এজলাসে থাকা অভিযুক্ত তিন সেনা কর্মকর্তা- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক (সিটিআইবি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক (সিটিআইবি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক (সিটিআইবি) মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন হাত উঠিয়ে সালাম দেন। আযমীও হাত উঠিয়ে সালামের জবাব দেন।



