ভাদ্রের তালপাকা রোদ। নীল আকাশে উড়ছে সাদা মেঘ। নদীর পারে বাতাসে দুলছে কাশফুল। যতদূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। সেই পানির বুকে হাওয়ার মৃদু দোলা- ছোট ছোট ঢেউ তালে তালে মাথা নাড়ছে।
শান্ত পানির বুকে হঠাৎ ছন্দের ঝড় ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসছে মানুষের কোলাহল। চোখে পড়ে একেকটি ছিপছিপে, দীঘল নৌকা। পানির বুক চিরে তারা ছুটে আসছে- স্থির হাওরের বুকে যেন হঠাৎ ডানা মেলেছে একঝাঁক পাখি। কে কাকে পেছনে ফেলবে, তা নিয়ে শুরু হয় তুমুল প্রতিযোগিতা! নৌকার দুই পাশে সারি বেঁধে বসা মাঝিরা একসাথে টানছেন বৈঠা। সামনের গলুইয়ে বসে গায়েন। তার কণ্ঠে দরাজ সুর-
‘রঙ্গিলা বাড়ইয়ে দিছইন খেলুয়া বানাইয়া...
হায়রে আমার পাইকল বাইয়া...
ও মাঝিরে বৈঠা চালাইও ধুমছাইয়া...
পড়িলে করতালে বাড়ি, বৈঠায় দিও টান রে...’
একেকটি কলি শেষ হতেই মাঝিদের সমস্বরে ধ্বনি ওঠে- ‘হেইও, হেইও!’
পেছনের নৌকা তখন আরো কাছে। গায়েন কাঁসিতে শব্দ তোলেন। বাড়ে বৈঠার গতি, তীব্র হয় গানের সুর। মাঝিদের শরীর ঝুঁকে পড়ে সামনে। একসাথে ওঠে, একসাথে নামে বৈঠা। শুরু হলো ‘ছুব’। মুহূর্তেই শান্ত হাওর বদলে যায়। পানিতে ওঠে তুমুল ঝড়। দু’পাশে উড়ে যায় পানির ছিটা। নৌকা ছুটে চলে ‘গুট্টাঘরের’ দিকে। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষ তখন আর স্থির থাকতে পারেন না। কেউ হাততালি দেন, কেউ হাত নেড়ে পছন্দের নৌকাকে উৎসাহিত করেন। চার পাশে ওঠে হর্ষধ্বনি- ‘হৈ হৈ... হৈ হৈ...’, ‘আগ্গয়া যাও! আগ্গয়া যাও!’
বৈঠার শব্দ, গানের সুর আর হাজারো মানুষের চিৎকারে তৈরি হয় এক অনন্য দৃশ্য। এভাবেই কিশোরগঞ্জের ইটনার হাওরে ফিরে আসে বাংলার পুরনো নৌকাবাইচের উন্মাদনা।
হাওরজুড়ে আনন্দ : গতকাল শনিবার ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজার সংলগ্ন ‘সুরমা’ নদীতে অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচ দেখতে জড়ো হয়েছিলেন লাখো মানুষ। দুপুরে নৌকাবাইচ শুরু হলেও সকাল থেকেই মানুষ এসে জড়ো হয়। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা তো বটেই, আশপাশের জেলা থেকেও অনেকে ছুটে এসেছিলেন এই আয়োজন দেখতে। আয়োজকদের দাবি, বিকেল পর্যন্ত থাকা এ আয়োজনে লাখো মানুষের সমাগম হয়।
হাওরবাসীর কাছে এ নৌকাবাইচ শুধু উৎসব নয়, এটি শৈশবের স্মৃতি, আবার কারো কাছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের সাথে পুনর্মিলনের দিন ছিল।
স্থানীয়রা জানান, কিশোরগঞ্জে নৌকাবাইচের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। একসময় নিকলীতে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের প্রথম দিন নৌকাবাইচ হতো। এ উপলক্ষে হাওরাঞ্চলে তৈরি হতো উৎসবের আবহ। কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার অনেক লোকজ খেলা ও বিনোদনের মতো নৌকাবাইচও হারিয়ে যেতে বসে। নিকলীতে ৯ বছর আগে সর্বশেষ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। আর ইটনায় সর্বশেষ ৫০ বছর আগে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবার ইটনায় এ আয়োজন করা হয়।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের উৎসাহে ধনপুর ইউনিয়নবাসী এই নৌকাবাইচেরা আয়োজন করেন। দুপুর ১২টায় শুরু হয় নৌকাবাইচ। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ১০টি নৌকা।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ফজলুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখা। উপস্থিত ছিলেন- জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ সেন্ট্রাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশরাফুল ইসলাম।
প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার ছিল সোনার হরিণ, দ্বিতীয় পুরস্কার রুপার ময়ূর এবং তৃতীয় পুরস্কার এলইডি টিভি। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী নৌকার মালিকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি।
অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, নৌকাবাইচ ভাটিবাংলার উৎসব। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের উৎসব এটি। এই উৎসব এখন হারিয়ে যাচ্ছে। ৫০ বছর আগে আমি বাবার সাথে ইটনায় নৌকাবাইচ দেখতে এসেছিলাম। এ আয়োজনের উদ্দেশ্য পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সাথে যুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
নৌকাবাইচ আয়োজক কমিটির সদস্য ও ধনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ভজন কান্তি দাস জানান, ‘ইটনার নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ সুরমা নদীর দুই পাড়ে নৌকা নিয়ে এসে ভিড় করেন। দুপুরে লোকসমাগম লাখ ছাড়িয়ে যায়।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বোরো ধান কাটা শেষ হলে শুরু হয় বাইচের প্রস্তুতি। পুরনো নৌকা মেরামতের পাশাপাশি তৈরি করা হয় নতুন ‘দৌড়ের নাও’। মাঝিরাও শুরু করেন অনুশীলন। সবশেষেই এই আয়োজন।
নৌকাবাইচ সম্পর্কে যা জানা গেল : কিশোরগঞ্জে নৌকাবাইচকে বলা হয় ‘নাওদৌড়’, ‘খেলুয়াদৌড়’ বা ‘নাওদৌড়ানি’। নৌকাকে বলা হয় দৌড়ের নাও। তবে নৌকাবাইচের সৌন্দর্য শুধু নৌকার দৌড়ে নয়; এর প্রাণ ছড়িয়ে আছে বৈঠার ছন্দ, গানের সুর এবং মাঝিদের সম্মিলিত শক্তিতে।
বাইচের নৌকা হয় ছিপছিপে, সরু ও লম্বা- পানির বুক কেটে দ্রুত ছুটে চলার উপযোগী করে তৈরি। সামনের গলুই সাজানো হয় নানা কারুকাজে। কোথাও ময়ূরের মুখ, কোথাও রাজহাঁস, কোথাও অন্য কোনো পাখির অবয়ব। উজ্জ্বল রঙে নৌকার গায়ে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা নকশা। একেকটি নৌকার দৈর্র্ঘ্য থাকে ১০০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত। অঞ্চলভেদে এর আকৃতিতেও রয়েছে পার্থক্য।
ঢাকা, গফরগাঁও ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাইচে ব্যবহৃত হয় কোশা আকৃতির নৌকা। টাঙ্গাইল ও পাবনায় দেখা যায় ভিন্ন ধরনের নৌকা। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত সারেঙ্গী নৌকা। চট্টগ্রাম, নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চল ও সন্দ্বীপে ব্যবহৃত হয় সাম্পান। এ ছাড়াও ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চলে গয়না নৌকার ব্যবহারও রয়েছে।
নৌকার নামেও থাকে বিচিত্র কল্পনা- অগ্রদূত, ঝড়ের পাখি, পঙ্খীরাজ, ময়ূরপঙ্খী, সাইমুম, তুফান মেল, সোনার তরী, দীপরাজ। তবে নৌকার যত সৌন্দর্যই থাক, বাইচের আসল শক্তি মাঝিরাই।
তিন ধরনের বাইচের নৌকা : কিশোরগঞ্জের নৌকাবাইচে সাধারণত তিন ধরনের নৌকা দেখা যায়- ‘চুখা গলই’, ‘চ্যাপ্টা গলই’ ও ‘বইয়া খাউরি’। ‘চুখা গলই’ লম্বা ও সরু, গলুই হয় সুঁচের মতো চিকন। ‘চ্যাপ্টা গলই’-এর গলুই চ্যাপ্টা ও খাটো। আর ‘বইয়া খাউরি’ ছোট ও চিকন হওয়ায় একবার এগিয়ে গেলে তাকে ধরা কঠিন। প্রতিপক্ষের নৌকাকে পেছনে ফেলে ‘চ্যাপ্টা গলই’ যে ঢেউ তোলে, তাতে পেছনের নৌকার এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ‘বইয়া খাউরি’ নৌকার সামনের গলুইয়ে কোনো ময়ূর না থাকলেও বাকি দুই প্রকারের নৌকায় ময়ূর থাকে।
নৌকা প্রতিযোগিতার ইতিহাস শুধু বাংলায় সীমাবদ্ধ নয়। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় দুই হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার মানুষ ইউফ্রেটিস নদীতে নৌকা প্রতিযোগিতার আয়োজন করত বলে জানা যায়। পরে মিসরের নীলনদেও শুরু হয় এ প্রতিযোগিতা। সময়ের সাথে তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে।
আজও অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নৌকাবাইচ’ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। আধুনিক অলিম্পিকেও ‘রোয়িং’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া ইভেন্ট।
নদী বাঁচলে বাইচও বাঁচবে : একসময় বাংলার নদী-খাল-বিলের সাথে নৌকাবাইচের ছিল গভীর সম্পর্ক। এখন সেই নদীই অনেক জায়গায় সঙ্কুচিত, দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত। কোথাও স্বাভাবিক প্রবাহ থেমে গেছে, কোথাও পানিই নেই।
নদী শুকিয়ে গেলে শুধু নৌকা চলাচল বন্ধ হয় না; হারিয়ে যায় নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা, গান, উৎসব ও লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান। নৌকাবাইচও সেই হারানোর তালিকায়।
তবে এতদিন পরে নিকলী হয়ে ইটনার হাওরে যখন দৌড়ের নাও ছুটে চলে, শত শত বৈঠা একসাথে পানিতে নামে, গায়েনের কণ্ঠে ‘হাইর’ গান ওঠে, তখন মনে হয়- বাংলার নদী এখনো তার পুরনো স্মৃতি হারায়নি।



