জমছে কোরবানির পশুর হাট

দরদামে ব্যস্ত ক্রেতা-বিক্রেতারা : ছোট ও মাঝারি গরুর দাম চড়া

Printed Edition
জমছে কোরবানির পশুর হাট
জমছে কোরবানির পশুর হাট

নিজস্ব প্রতিবেদক

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কোরবানির চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের পশুর হাটগুলো এখন পুরোপুরি প্রস্তুত এবং কেনাবেচায় মুখরিত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে দরদাম আর পছন্দের পশু বেছে নেয়ার প্রতিযোগিতা।

চলতি বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে মোট ২৬টি (উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে ১৩টি করে) অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাট বসেছে। এ ছাড়াও সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাজারো হাটে পশু কেনাবেচা চলছে।

খামারি এবং ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, এবার হাটে দেশি গরুর সরবরাহ সবচেয়ে বেশি। সীমান্ত পার হয়ে আসা পশুর চেয়ে দেশীয় খামারে প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ লক্ষণীয়। গাবতলী, দিয়াবাড়ী, মেরাদিয়া কিংবা আফতাবনগরের মতো বড় বড় হাটগুলোতে ‘কালা মানিক’, ‘কালো জামাই’, ‘লাল বাদশাহ’ বা ‘টাইগার’ এর মতো বিশাল আকৃতির ও বাহারি নামের গরুর পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর সমাগম ঘটেছে প্রচুর।

দামের চালচিত্র ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের মনস্তত্ত্ব

বাজারে পশুর কোনো ঘাটতি না থাকলেও ক্রেতা ও বিক্রেতা-উভয় পক্ষের মধ্যেই রয়েছে কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

মাঝারি ও ছোট গরুর চাহিদা তুঙ্গে : বাজারে এক লাখ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। হাটে আসার সাথে সাথেই এই সাইজের গরুগুলো দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

বড় গরুর ক্রেতা সীমিত : বিশাল আকৃতির ও চড়া দামের (পাঁচ থেকে ২০ লাখ টাকা বা তার বেশি) গরুগুলো দেখতে হাটে উৎসুক জনতার ভিড় জমলেও, প্রকৃত ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক কম।

গো-খাদ্যের দামের প্রভাব : বিক্রেতা ও খামারিদের দাবি, গত এক বছরে খৈল, ভুষি ও খড়ের দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে এবার পশুর উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে কাক্সিক্ষত লাভ নিয়ে তারা কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছেন। অন্য দিকে, ক্রেতাদের একাংশের অভিযোগ, বিক্রেতারা শুরুতেই অতিরিক্ত দাম হাঁকাচ্ছেন, যা সাধারণ মধ্যবিত্তের বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ডিজিটাল হাটের জনপ্রিয়তা

কোরবানির পশু কেনাবেচায় প্রথাগত হাটের পাশাপাশি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অনলাইনভিত্তিক ‘ডিজিটাল হাট’। বিশেষ করে নগরজীবনের কর্মব্যস্ত মানুষ ভিড়, যানজট, কাদা-পানি ও সময়ের ঝামেলা এড়াতে এখন ঘরে বসেই পশু কেনার দিকে ঝুঁকছেন। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে এই প্রবণতা আরো বেড়েছে।

ডিজিটাল হাটগুলোতে ক্রেতারা পশুর ছবি, ভিডিও, লাইভ ওয়েট, স্বাস্থ্যগত তথ্য এবং দাঁত দেখে বয়স নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক প্ল্যাটফর্ম আবার ভিডিও কলে পশু দেখানোর ব্যবস্থাও রেখেছে। এতে ক্রেতারা সরাসরি হাটে না গিয়েও তুলনামূলক স্বচ্ছভাবে পশু নির্বাচন করতে পারছেন।

শুধু পশু বিক্রিই নয়, অনলাইনভিত্তিক সেবায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সুবিধা। অনেক প্রতিষ্ঠান ওজন অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ, বাসায় পশু পৌঁছে দেয়া, কসাই সরবরাহ এবং ঈদের দিন গোশত কেটে প্যাকেট করে দেয়ার মতো সমন্বিত সেবা দিচ্ছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীদের মধ্যে এসব সেবার চাহিদা বাড়ছে।

তবে অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা, পশুর প্রকৃত ওজন বা স্বাস্থ্য নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগও রয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্টরা বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম বেছে নেয়া এবং কেনার আগে পর্যাপ্ত তথ্য যাচাইয়ের পরামর্শ দিচ্ছেন।

নিরাপত্তা ও হাসিল পরিস্থিতি

জাল নোটের কারবার রোধে প্রায় প্রতিটি বড় হাটে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ‘জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ’ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও হাটের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টির দৌরাত্ম্য ঠেকাতে পুলিশ, র‌্যাব এবং সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। সরকারের কঠোর নির্দেশনার কারণে হাসিল আদায়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ নেয়ার অভিযোগ এবার অনেকটাই কম।

বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত : “হাটে পশুর পর্যাপ্ত জোগান রয়েছে, তাই কৃত্রিম সঙ্কটের কোনো সুযোগ নেই। শেষ মুহূর্তের হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার সমঝোতার মাধ্যমে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে এবং বেচাবিক্রি আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।”

গাজীপুরে হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার সরব উপস্থিতি

বাসস জানায়, গাজীপুরের কোরবানির পশুর হাটগুলো জমে উঠতে শুরু করেছে। পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গাজীপুর ও এর আশেপাশের এলাকায় কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার সরব উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। গত কয়েক দিন ধরে বেচাকেনা কম হলেও আজ সোমবার জেলার পশুর হাটগুলোতে বেচাকেনা পুরোদমে শুরু হয়েছে। গাজীপুর জেলায় উৎপাদিত কোরবানির পশু ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও পাইকাররা গরু, মহিষ, ছাগল ভেড়া নিয়ে এসেছে হাটগুলোতে। আজ সোমবার জেলার উল্লেখযোগ্য হাটগুলোতে সরেজমিন গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

জেলার কালীগঞ্জের জাঙ্গালিয়া গরুর হাট, কাপাসিয়ার আমরাইদ বাজার, টঙ্গীর বৃহত্তম গরু-ছাগলের হাট, ভবানীপুর মুক্তিযোদ্ধা কলেজ মাঠ, মৌলা বাজার এবং কাশিমপুরের পশুর হাটগুলোতে প্রচুর দেশি ও বিদেশী জাতের গবাদিপশু আসতে শুরু করেছে।

কালীগঞ্জের জাঙ্গালিয়া বাজারে ১৪টি গরু নিয়ে আসেন স্থানীয় বেপারি আবুল কাশেম। তিনি বাসসকে বলেন, এই হাটে আজ পাঁচটি গরু বিক্রি করেছি। ক্রেতাদের আগমন বেশ ভালো। আশা করছি, বাকিগুলিও বিক্রি হয়ে যাবে। অনেকে গরুর দরদাম করছেন। গরু কিনেও নিয়ে যাচ্ছেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এবারের ঈদে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় বসেছে বৃহৎ ১৬টি পশুর হাট। এ ছাড়া জেলার চারটি উপজেলায় ছোট বড় আরো ৯৩টি পশুর হাট বসেছে। সব মিলিয়ে গাজীপুরে মোট ১০৯টি পশুর হাট বসানো হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এবার গাজীপুর জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় খামারি ও গৃহস্থরা দেশীয় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়াসহ মোট এক লাখ দুই হাজার ২৬৩টি কোরবানির পশু প্রস্তুত করেছেন। অন্য দিকে জেলায় কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা রয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৫৩৬টি পশুর। সে হিসেবে প্রায় ২৯ হাজার ২৭৩টি পশুর ঘাটতি রয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পশু আসার মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জমে উঠেছে রাজধানীর পশুর হাট

ঈদের দুই দিন আগে রাজধানীতে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার ২৭ হাটে পশু নিয়ে এসেছেন খামারিরা। হাট ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতার চাহিদার শীর্ষে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু। দাম অনেকটা সহনীয়। আর বড় গরুর চাহিদা কম হলেও দাম অনেক বেশি। অন্য দিকে ছাগল, খাসি, ভেড়া, দুম্বার মধ্যে খাসি ও ছাগলের চাহিদা শীর্ষে। আর চাহিদার সবচেয়ে নিচে উট ও মহিষ।

ক্রেতাদের ভাষ্য, এ বছর ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে। যার ফলে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা বাজেটের গরুর চাহিদা এখন সবচেয়ে বেশি। তবে ঈদের মাত্র দুই দিন বাকি থাকায় শেষ মুহূর্তের কেনাবেচায় দামের কিছুটা তারতম্য ঘটছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট সাইজের গরু যাতে গোশতের পরিমাণ ৬০ থেকে ১০০ কেজি বা তার কম এমন গরুর দাম ৭০ হাজার থেকে ৯৫ হাজারের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অন্য দিকে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি সাইজের গরু যেগুলোতে গোশতের পরিমাণ আনুমানিক ১২৫ থেকে ১৮০ কেজি। এমন গরু সাধারণত এক লাখ ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। আর বড় সাইজের গরু যেগুলোতে গোশতের পরিমাণ ২০০ থেকে ৩০০ কেজি বা তার বেশি সেগুলো দুই লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা কেনাবেচা চলছে। আর জায়ান্ট বা বিশাল আকৃতির গরু পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে টাকা ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে।

অন্য দিকে খাসি ছাগলের মধ্যে আকার অনুযায়ী ১২ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে। ভেড়া আকারভেদে ১০ হাজার থেকে ২৫ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। আর উন্নত জাতের ভেড়া ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে। দুম্বা এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকছেন।

অন্য দিকে দেশীয় খামারে লালন-পালন করা এবং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত দুই ধরনের উটই হাটে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণত এগ্রো ফার্ম বা হাটে মাঝারি আকারের উটগুলোর দাম ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, বড় ও উন্নত জাতের উট ২০ লাখ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। দেশী মহিষের দাম তিন লাখ থেকে লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত দরদাম চলছে। অন্য দিকে বিশাল আকারের কালো বা গোলাপি রঙের মহিষগুলোর দাম ১০ লাখ থেকে শুরু করে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী রাজধানীতে এবার মোট ২৭টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসেছে। উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মোট হাটের সংখ্যা ১১টি। এর মধ্যে ১০টি অস্থায়ী এবং একটি স্থায়ী। অন্য দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ১৭টি হাট বসেছে। এর মধ্যে ১৬টি অস্থায়ী এবং একটি স্থায়ী।