শাকেরা বেগম শিমু
এক শুক্রবার পবিত্র দিনে আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে রওনা দেই কানাডার উদ্দেশে। দুটি জিপ গাড়িতে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও খাবার দাবার নিয়ে সকাল ১০টায় বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি।
গাড়িতে উঠেই সবাই প্রথমে যানবাহনে চড়ার দোয়াটা পড়ে নিলাম। যাতে এত দূরে ভ্রমণে যেতে কোনোরকম দুর্ঘটনার শিকার না হতে হয়। তার পরই বাতাসের বেগে আমাদের জিপ দুটি এগিয়ে চলল সোজা কানাডার দিকে! আমরা তখন অনেক এক্সাইটেড ছিলাম। নতুন স্থানে বেড়াতে যাবো। নতুন অভিজ্ঞতা হবে, আনন্দ হবে আরো অনেক কিছু বলাবলি করে আমরা আমাদের রোমাঞ্চকর ভ্রমণটা উপভোগ করতে লাগলাম। পাশের খোলা জানালা দিয়ে ফুরফুরে সতেজ হাওয়া এসে গায়ে লাগছে আর ক্ষণে ক্ষণে যেন শরীরটা শিহরণ দিয়ে উঠছে। এভাবে ক্রমাগত ড্রাইভ করে দুই ঘণ্টার মধ্যে আমাদের গাড়ি আমেরিকা ও কানাডার মধ্যখানে যে বড় নদীটি অবস্থিত তার ওপরের বিশাল কংক্রিটের ব্রিজে উঠে পড়ল। এই ব্রিজের অর্ধেক পড়েছে আমেরিকায় ও বাকি অর্ধেক কানাডায়। ব্রিজটা পাড়ি দিলেই আমরা চলে যাবো আমেরিকার প্রতিবেশী দেশ ও আরেক স্বপ্নরাজ্য কানাডায়! সাদী ব্রিজের মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে টিকিট কাউন্টারে গিয়ে তার টিকিট পাসপোর্ট সব দেখিয়ে আমাদের সবার জন্য একটি করে টোকন নিয়ে নিলো। আর তার পরই আমরা প্রবেশ করলাম আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যের দেশ কানাডায়।
কানাডার প্রকৃতি : কানাডায় প্রবেশ করে প্রথমে আমরা প্রায় একনাগাড়ে ঘণ্টাখানেক পিচঢালা পথ ধরে এগিয়ে চললাম। যেতে যেতে পথের দুই পাশের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও কানাডার পরিচ্ছন্ন পরিপাটি পরিবেশটা উপভোগ করতে থাকলাম। দুই পাশের বেশির ভাগই ছিল গম ও ভুট্টা ক্ষেত। তারপর আছে ধানক্ষেত, তেঁতুল বাগান, নাশপাতি, আপেল, ক্রিসমাস ট্রি’র সারি। একটু ঢালু জায়গায় মেশিন দিয়ে উপর থেকে নিচের দিকে মসৃণভাবে কাটা হয়েছে ভুট্টা গাছের সারি। দেখে মনে হচ্ছে এটি বুঝি সিলেটের চা বাগানের দৃশ্য। কিন্তু না! এটি সিলেট নয় বরং কানাডার ভুট্টাক্ষেতের দৃশ্য। প্রকৃতির মাঝে এত নিখুঁত কারুকার্য দেখে আমাদের দুই চোখ জুড়িয়ে গেল। মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন কোনো সবুজ রঙের সিঁড়ি তৈরি করে রেখেছে তার নিজ হাতে। রাজপথের দুই পাশে আরো কিছু গাড়ি, জিপ, ট্রাক ইত্যাদি একটু পরপর নিজেদের মতো আসা যাওয়া করছিল। কানাডায় কিন্তু আমেরিকার মতো এত বিস্তর যানজট নেই। বরং এখানে আছে বিশুদ্ধ নির্মল পরিবেশ, দখিনা বাতাস আর একটু পর পর বিশাল ভুট্টা বা গমের ক্ষেত। এই ভুট্টাই কানাডার প্রধান খাদ্যশস্য। তাই এখানে এর চাষও হয় বেশি। যেতে যেতে দূরে কিছু জলাশয়ও চোখে পড়ল যেগুলোর পানি ছিল স্বচ্ছ ও নীলাভ। নিচের বালু পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এমন নীলাভ ও পরিষ্কার পানিই কানাডার জলাশয়গুলোর। এ সময় জলপ্রপাতের সব সৌন্দর্য উপভোগ করে আবার রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। তার পর রওনা করলাম হোটেলের উদ্দেশে। কেননা, আজ রাতটা বিশ্রাম নিয়ে কালকে আবার বেরুতে হবে আমাদের আরেকটা গন্তব্য নীল জলে নীলাম্বরী শেডস লেক-এর উদ্দেশে। সে জন্য ও তো আবার নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।
হোটেলে পৌঁছার পর : নায়াগ্রা থেকে এক ঘণ্টা ড্রাইভ করে আমরা পৌঁছলাম এক ইন্ডিয়ান হোটেলে। পৌঁছানোর পর আমরা ভালো একটি জায়গা দেখে আমাদের গাড়ি দুটো পার্কিং করে রাখি। প্রথমে অবশ্য জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। কেননা তখন অনেক গাড়ি ইতোমধ্যে পৌঁছে সেখানের পার্কিংয়ের সব জায়গা দখল করেছে। শেষমেশ আল্লাহর রহমতে আমরা ছোট্টমতো একটি জায়গা পেয়ে সেখানে আমাদের গাড়ি দুটো পার্কিং করে নেমে আসি। তার পর আমরা ভেতরে ঢুকে আমাদের জন্য দু’টি ডাবল বেড কামড়া বুকিং করি। তার পর সবাই নিজেদের রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। সারা দিনের লং জার্নি ও নায়াগ্রা ফলসে ঘুরাঘুরির ক্লান্তিতে অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা ঘুমে তলিয়ে গেলাম। পরের দিন সকালে উঠে আবারো আমরা ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলাম ব্রেকফাস্টের উদ্দেশ্যে। ভারতীয় খাবারগুলো ছিল খুবই সুস্বাদু। আমরা সবাই পেটপুরে নাস্তা সাবার করলাম। তার পর কয়েক কপি ছবি তুলে আমরা ফিরে এলাম আমাদের কামড়ায়। এর প্রায় ১ ঘণ্টা পর আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য ‘শেডস লেক’-এর উদ্দেশে।
লেকে পৌঁছার পর : হোটেল থেকে বেরিয়ে আমরা আরো ঘণ্টাখানেক ড্রাইভ করার পর শেষে দেখা পেলাম সেই নীল জলে নীলাম্বরী শীতল পানির ‘শেডস লেক’-এর দেখা। যেতে যেতে অবশ্য আরো অনেক সুন্দর দৃশ্যও দেখেছিলাম। কখনো পাহাড়ের মতো ঢালু জায়গায় ভুট্টার চাষ হচ্ছে অনেকটা বাংলাদেশের পাহাড়ি জুমচাষের মতো। কখনোবা ক্রিসমাস ট্রি’র ফরেস্ট। আবার কখনো ছোট ছোট জলাশয়ে ফুটে রয়েছে বিভিন্ন জলজ ফুল। কখনো বিশাল সবুজঘেরা মাঠ ঠিক মনে হয় তেপান্তরের মাঠ যেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে সব কিছু উপভোগ করে পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। সেখানে তখন অনেক লোকজন এসেছিল। আমরাও গিয়ে আমাদের গাড়ি দুটো একপাশে পার্কিং করে নেমে গেলাম জিপ থেকে। তার পর গাছের ছায়াবেষ্টিত একটি খোলা জায়গায় বড় চাদর বিছিয়ে সেখানে দরকারি জিনিসপত্র রেখে আমরাও বসে পড়ি। তখন লেকের জলের শীতল বাতাস ও গাছের ছায়ায় বসে আরামে শরীরটা জুড়িয়ে গেল। কী টলটলে স্বচ্ছ নীলপানির লেক! এখানে নেই গতকালের নায়াগ্রা ফলসের মতো খরস্রোতা পানি, আছে শীতল নীরব শান্ত পানি। নেই সেই তীব্র ঘায়েল করা পানির গর্জন আর সেই নায়াগ্রা জলপ্রপাত ও এই শেডস লেক! দুটিই দেখতে অসাধারণ সুন্দর পানির উৎস কিন্তু একটি যেন প্রাণঘাতী মরণ আরেকটি শান্ত শীতল মিষ্টি পানি; যার অপর নাম জীবন!
নৌকায় চড়া : কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বোটে চড়ব বলে। দুলাভাই টিকিট কাউন্টারে গিয়ে আমাদের সবার জন্য একটি করে টিকিট কেটে নিলেন। তারপর অন্য রুমে গিয়ে আমাদের বোটে চড়ার পোশাক এনে তা সবাইকে পরিয়ে দিলেন। এর পর শুরু হলো নৌকা ভ্রমণের পালা। শফিউল সাদী ও ইউসুফ একটি বৈঠাওয়ালা লম্বা সাইজের বোটে উঠে পড়ল। এ দিকে আমি দুলাভাই আর পিচ্চি ইয়ামিন ও মারইয়াম উঠলাম প্যাডেলওয়ালা এক বোটে। যেখানে সামনে ও পেছনে দুটি করে মোট চারটি সিট রয়েছে। দুই বেবিকে পেছনের সিটে বসিয়ে রেখে আমি ও দুলাভাই সাইকেলের মতো নৌকার প্যাডেল মারতে লাগলাম। কিন্তু নৌকা তো আর এগোয় না! যাইবা এগোচ্ছে একেবারে কচ্ছপের গতিতে। এ দিকে শফি ও সাদীরা তাদের নৌকা নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারা আবার সেখানে গিয়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরাও শুরু করেছে। আর আমরা লেকের মাঝ বরাবরই আসতে পারিনি। একপর্যায়ে খুব বিরক্ত লেগে যায়। আনন্দটাই যেন নষ্ট হয়ে গেল। ব্যাটার প্যাডেলওয়ালা নৌকার জন্য। একপর্যায়ে আমরা দু’জন এক সাথে জোরে জোরে প্যাডেল মারতে থাকি। এতে নৌকা অনেকটা এগিয়ে যায়। বড় আপু লেকের পাড়ে বসে এই সব কিছু তার আইফোনে ভিডিও করে নিচ্ছিল। সে আর নৌকা চড়তে আসেনি। তার নাকি ওসব করতে মন চাইছে না। তাই আমরাও আর জোর করিনি। যা হোক মাঝ দরিয়ায় এসে চারদিকে তাকালাম একবার। বাহ্ কী অপূর্ব লাগছে দেখতে। চারদিকে আরো অনেক দেশ বিদেশের লোকজন নৌকা নিয়ে নিয়ে তারাও নিজেদের মতো আনন্দ করছে, কেউ বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে ব্যস্ত, কেউবা আবার লেকের ওপারে গিয়ে উঠে সেখানে বসে ফোন দিয়ে ছবি তুলছে বা ভিডিও করছে, আর বীচের দিকে সবাই পানিতে নেমে হৈহুল্লড় করছে। বড়দের সাথে সেখানে ছোট শিশুরাও আছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি আমরা কোনো সমুদ্রের মাঝখানে চলে এসেছি আর আমাদের কচ্ছপের গতিওয়ালা নৌকাটা যেন এক টাইটানিক জাহাজ। পরে না আবার এই লেকের পানিতেই সলিল সমাধি হয়ে যায়! বাপরে! তখন আমিও আমার ফোন বের করে চারপাশের সব কিছু কয়েকবারে ভিডিও করে নিলাম। সাথে কিছু ছবিও তুলে নিলাম। আর জানি না কখনো এখানে আসা হবে কিনা এই ‘শেডস লেক’-এ। তাই এই সুন্দর স্মৃতিগুলো ক্যামেরাবন্দী করলাম। ততক্ষণে সাদীরাও তাদের নৌকা নিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু এতক্ষণে একটি মাছও পায়নি। বেশ হয়েছে। আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে বাহাদুরি করছিল- তোমরা যা কচ্ছপের গতিতে নৌকা চালাছে তাইতো এখনো ওখানেই রয়ে গেছ। অথচ শেষমেশ খরগোশের ভাগেও জুটেছে লবডঙ্কা। অবশেষে অনেকটা সময় আমরা নিরাপদে ডাঙায় ফিরে এলাম।
ডাঙায় ফেরার পর : নৌকা ভ্রমণ শেষ করে আমরা সবাই বোটে চড়ার পোশাক খুলে কাউন্টারে ফেরত দিয়ে এলাম। ততক্ষণে সবার ক্ষুধাও পেয়ে গেছে। আমরা সবাই তখন সাথে করে নিয়ে আসা খাবারগুলো সাবার করে দিলাম। এর পর সবাই জোহরের কসর নামাজ আদায় করে নিলাম। কেননা আমরা এখন মুসাফির, তাই চার রাকাত না পড়ে দুই রাকাত কসর পড়ার নিময়। আমরা সেভাবেই নামাজ সেরে আরো কিছুক্ষণ এই নীলাম্বরী লেকের চারদিকে হাঁটাহাঁটি করে সব কিছু মন ভরে দেখে নিলাম।
ফেরার পথে : সব কিছু মন ভরে উপভোগ করার পরে আমরা আবার রওনা করলাম আমাদের গৃহের উদ্দেশে। অর্থাৎ আমেরিকা অভিমুখে। মাঝপথে অবশ্য গাড়ি থামিয়ে এক রেস্টুরেন্টে ঢুকে আহারটা সেরে নিলাম। সেই রেস্তোরাঁর পেছনে ছিল একটি সুন্দর নাশপাতি গাছ, যেটাতে ঝুলছিল পাকা পাকা নাশপাতি। নাশপাতি আগে অনেক খেয়েছি কিন্তু গাছে ধরা অবস্থায় এই প্রথম দেখলাম। সেটারও কয়েক কপি ছবি তুলে নিলাম। তার পর আসরের কসর আদায় করে আবার যাত্রা করলাম আমেরিকার দিকে। তবে অনেক দিন মনে থাকবে এই আনন্দময় ভ্রমণের কথা। কানাডার বিখ্যাত ‘নায়াগ্রা জলপ্রপাত’ ও সাথে নীল জলে নীলাম্বরী ‘শেডস লেক’!



