চৌগাছায় ৬ প্রতিবন্ধী স্কুল কাগজে সচল, বাস্তবে নেই

আ’লীগ নেতাদের কোটি টাকার বাণিজ্য

Printed Edition

এম এ রহিম চৌগাছা (যশোর)

যশোরের চৌগাছা উপজেলায় কাগজে-কলমে কার্যক্রম পুরোপুরি সচল দেখিয়ে ছয়টি প্রতিবন্ধী স্কুলের এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়েছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে বাস্তবে বেশির ভাগ স্কুলের কোনো কার্যক্রম ও অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠান প্রধান ও স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠা করা এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ কেন্দ্র করে শিক্ষকভেদে ৫-১৫ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত দল মাঠে গিয়ে রীতিমতো হতবাক হয়েছেন। দুই-একটির অবকাঠামো থাকলেও নেই কোনো শিক্ষার্থী বা নিয়মিত কার্যক্রম। বিষয় জানাজানি হওয়ার পর থেকে এলাকায়জুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

জানা যায়, বিগত আ’লীগ সরকারের আমলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত রান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি বেসরকারি এনজিওর মাধ্যমে চৌগাছা উপজেলায় ছয়টি প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মধ্যে একটি এনডিডি (স্নœায়ু ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী) এবং পাঁচটি নন-এনডিডি (প্রতিবন্ধী) শ্রেণির স্কুল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এনজিওর মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলে ১৫ থেকে ২৮ জন পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। পরে এনজিওটির বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২০১৯ সালে স্কুলগুলো সরাসরি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের পাশাপোল বাজারের পাশেই ২০১৫ সালে শহীদ মতিউর রহমান অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল (নন-এনডিডি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রধান শিক্ষকসহ মোট ২৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। এমপিওর জন্য অনলাইনে আবেদন করাও হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্য করে আ’লীগ নেতা অবাইদুল ইসলাম ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

একইভাবে ২০১৬ সালে স্বরূপদাহ ইউনিয়নের খড়িঞ্চা বাজারের পশ্চিম পাশে নাসির উদ্দীন অটিস্টিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ স্কুলে ২২ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা ডোনেশন নিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে সেখানেও কোনো কার্যক্রম নেই। প্রধান শিক্ষক মাছুদুর রহমান জানান, আপাতত স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

উপজেলার সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের ২০১৪ সালে নগরবর্ণি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাস্তবে ওই স্থানে এখন কোনো স্কুলের অস্তিত্ব নেই। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান শিক্ষক আরিফুজ্জামান সাগর বলেন, আপাতত স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীরা সবাই অন্য পেশাই যোগদান করেছেন।

অন্য দিকে হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরূপপুর ২০১৬ সালে স্বরূপপুর অটিস্টিক প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্কুলের চকচকে অবকাঠামো থাকলেও নেই কাক্সিক্ষত শিক্ষার্থী। অথচ এই স্কুলে ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মহিদুল ইসলাম বলেন, স্কুল প্রতিষ্ঠাকালে স্থানীয় আ’লীগ নেতা নজরুল ইসলামের হাত ধরে ডোনেশন দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ করা হয়।

ধূলীয়ানী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া (রামভাদ্রপুর) বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী (এনডিডি) স্কুলের প্রধান শিক্ষক জুল হোসেন বলেন, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নামে আ’লীগ নেতারা নিয়োগবাণিজ্য করে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও বর্তমানে এ সকল স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন জাপন করছেন। পৌর শহরের ইছাপুর মাঠপাড়া এলাকায় ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী (এনডিডি) স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছেন এ স্কুলে। প্রধান শিক্ষক তুহিন উদ্দীন জানান, ২০২২ সালে অনলাইনে এমপিওর জন্য আবেদন করা হয়েছিল, তবে নানা কারণে বর্তমানে এমপিও কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে স্কুলটি চালু রেখেছি।

উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম বজলুর রহমান বলেন, এমপিওর জন্য অনলাইনে আবেদন করা ছয়টি স্কুলের কার্যক্রম যাচাই করতে সরেজমিন তদন্তে যাই। তদন্তে গিয়ে বেশির ভাগ স্কুলের অস্তিত্ব বা কার্যক্রমের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। ইউএনও ফারজানা ইসলাম জানান, তদন্ত সাপেক্ষে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।