ক্রীড়া প্রতিবেদক
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সাদা পোশাকে নামছে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দুই চক্রের ফাইনালিস্ট অস্ট্রেলিয়া। তার ওপর টেস্ট শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হারের ধাক্কা। ৫৪ রানে আলআউটের লজ্জা তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে আজ সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে মারারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের সামনে কঠিন এক পরীক্ষা। ওয়ার্ল্ড ক্লাস বোলিংয়ের বিপক্ষে চাপ সামলাতে প্রস্তুত নাজমুল হোসেন শান্ত বাহিনী।
আসন্ন সিরিজে স্পষ্ট ফেবারিট অস্ট্রেলিয়া। এখন পর্যন্ত ছয়টি টেস্ট খেলেছে দুই দল। যেখানে অসিদের জয় পাঁচটি। এর মধ্যে তিনটাতেই ইনিংস ব্যবধানে জিতেছে ক্রিকেটের পরাশক্তিরা। বাকি ম্যাচটা জিতেছে বাংলাদেশ। সবশেষ ২০১৭ সালে নিজেদের মাঠে হওয়া দুই ম্যাচের সে সিরিজটা ১-১ সমতায় শেষ করেছিল তারা।
প্রথম টেস্টের আগে অন্তত একটি জায়গায় স্বস্তি বাংলাদেশের। চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ফিট লিটন দাস। অস্ট্রেলিয়ান এক সাংবাদিকের সরাসরি প্রশ্ন ছিল, ‘লিটন দাস কি খেলবেন?’ বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্তর উত্তরও ছিল, ‘হ্যাঁ, সে এখন শতভাগ ফিট।’
প্রস্তুতি ম্যাচে লিটনকে না পাওয়ায় তার টেস্ট খেলা নিয়ে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ম্যাচের আগে ফিট হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও বাড়বে বলে মনে করছেন শান্ত। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে লিটনের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারের উপস্থিতি যে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেটি আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে লিটন ফিরলেও চ্যালেঞ্জের আকার ছোট হচ্ছে না। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। সেই সফরের দুই ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল তারা। এবার ২৩ বছর পর ফিরে এসে সেই ইতিহাস বদলানোর সুযোগ বাংলাদেশের সামনে। সাম্প্রতিক সময়ে টেস্টে বেশ কিছু বড় সাফল্য পেলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে সেই সামর্থ্য কতটা কাজে লাগানো যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রস্তুতি ম্যাচের ফলও বাংলাদেশকে খুব বেশি স্বস্তি দেয়নি। তিন দিনের ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে তারা। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামার আগে ব্যাটারদের ফর্ম নিয়ে চিন্তিত বাংলাদেশ। একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে পুরো তিন দিন খেলতে পারেনি সফরকারীরা। ইনিংস ও ৩৫ রানে হেরেছে শান্তর দল। প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে যায়। প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কেবল মেহেদী হাসান মিরাজের সেঞ্চুরি। অন্যদের হতাশাজনক ব্যাটিং চিন্তা বাড়িয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের। যদিও প্রস্তুতি ম্যাচের বাজে ব্যাটিংকে কেবল দুর্ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে শান্তর কাছে। সে ম্যাচের দুঃস্মৃতি ভুলে গিয়ে নিজেদের প্রতি বিশ্বাস রাখছেন বাংলাদেশ দলপতি।
ফলে মূল টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই করার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এসব হিসাব-নিকাশে খুব বেশি মনোযোগ দিতে চান না নাজমুল। তার কাছে ম্যাচের আসল লড়াই শুরু হবে প্রথম বল থেকেই, আর সেখান থেকে প্রতিটি সেশন ধরে এগোতে হবে, ‘আমরা তো খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই, প্রতিটি সেশন বাই সেশন খেলতে চাই।’
ম্যাচটি তিন দিনেই শেষ হবে, নাকি পাঁচ দিন পর্যন্ত গড়াবে- এ নিয়ে আলোচনা থাকবেই। কিন্তু বাংলাদেশের অধিনায়কের কাছে সেই হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজেদের ক্রিকেট। শান্ত বলেন, ‘প্রতিটি সেশন গুরুত্বপূর্ণ। চার দিন যাবে, পাঁচ দিন যাবে, নাকি তিন দিন যাবে- এ ধরনের আলোচনা থাকবেই। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের সব সময় লক্ষ্য থাকবে যে আমরা কত ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি। সবাই যার যার জায়গা থেকে আত্মবিশ^াসী।’
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সিরিজে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সকেও বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন শান্ত। তার মতে, একজন ব্যাটারের বড় স্কোর কিংবা একজন বোলারের পাঁচ উইকেট শুধু ম্যাচের ফলের জন্য নয়, দলের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আলাদা করে কাউকে প্রেরণা দেয়ার প্রয়োজন দেখছেন না তিনি, ‘কাউকে বাড়তি প্রেরণা দেয়ার প্রয়োজন নেই। সবাই জানে এখানে একটা বড় স্কোর, ৫ উইকেট, দল হিসেবে ভালো করা- এসব আমাদের নিজেদের জন্য ও আমাদের দলের ভবিষ্যতের জন্য খুব ভালো কাজে দেবে। এ প্রেরণাই সবার ভেতর কাজ করছে। আমার দেখে মনে হচ্ছে, ভালো করতে সবাই অনেক মনোযোগী।’
ডারউইনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে নতুন বল সামলানো। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে সাধারণত পেসাররা বাড়তি সুবিধা পান। মারারা স্টেডিয়ামের ড্রপ-ইন পিচে নতুন বলে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণ আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই বাংলাদেশের ব্যাটারদের শুরুটা সামলানোই হয়ে উঠতে পারে ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শান্তর পরামর্শ, নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে হবে এবং রান করার মানসিকতা রাখতে হবে। ‘আমার মনে হয়, নতুন বলে সব সময় সব জায়গায় চ্যালেঞ্জ থাকে, এখানে হয়তো একটু বেশি থাকবে। এখানে যতক্ষণে আমরা ব্যাটিং করব, যে-ই ব্যাটিং করবে, যার যার সহজাত খেলাটা খেলবে এবং রানের জন্য খেলবে।’
তবে শুধু শুরুটা সামলালেই হবে না। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ক্রিজে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন হবে অসীম ধৈর্য ও মনোযোগ। শান্তর মতে, ‘লম্বা সময় মনোযোগ ধরে রেখে ব্যাটিং করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারা খুবই ভালো বোলিং অ্যাটাক। তাই এই অ্যাটাককে ঠিকমতো সামলাতে হলে আমাদের অবশ্যই আরো অনেক বেশি মনোযোগ এবং ভালো চিন্তাভাবনা নিয়ে ব্যাটিং করতে হবে।’
পেসার নাহিদ রানা না থাকলেও যারা আছেন তাদের নিয়ে সন্তুষ্ট শান্ত, ‘দলে থাকা কিংবা বাদ যাওয়া এটি ক্রিকেটরই একটি অংশ। মেনে নিতে হবে। দলে যারা আছেন তাদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। নাহিদ থাকলে ভালো হতো তবে যারা আছেন তারাও কোনো অংশে কম নয়। পেসাররা তাদের সেরাটা দিতেই মুখিয়ে আছে।’
দোয়া চাইলেন মুমিনুল
প্রায় দুই যুগের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে বাংলাদেশের। ২০০৩ সালের পর প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। ডারউইনে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে কাল সকালে অজিদের বিপক্ষে খেলতে নামবে অতিথিরা। তার আগে দোয়া চাইলেন মুমিনুল হক সৌরভ।
নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেয়া এক বার্তায় মুমিনুল লিখেছেন, ‘টেস্ট ক্রিকেট ফিরেছে! ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আপনাদের শুভকামনা ও দোয়া চাই।’


