মার্কিন সামরিক শক্তি ভোঁতা করতে ইরানের ‘তেলঅস্ত্র’

রয়টার্স
Printed Edition

  • যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রতিহত করতে তেহরান জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করেছে

  • আইআরজিসি তার প্রক্সিদের দ্বারা দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত ছায়া যুদ্ধের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত সামরিক অভিযানের মুখে ইরান তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ কৌশল সক্রিয় করেছে। তেহরানের প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত তেলের সরবরাহ লাইনকে পণবন্দী করে ওয়াশিংটনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো। আঞ্চলিক সূত্র এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে একটি বড় ধরনের ‘অয়েল শক’ বা তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

হরমুজে অচলাবস্থায় থমকে গেছে তেলের প্রবাহ

ইরানের এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট উত্তোলিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই রুটে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াত ৯৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে কার্যত এই আন্তর্জাতিক জলপথটি এখন বন্ধ বললেই চলে।

আঞ্চলিক পরিকল্পনার সাথে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, ইরান কয়েক দশক ধরেই সঙ্কেত দিচ্ছিল যে, সরাসরি কোনো সঙ্ঘাতের মুখোমুখি হলে তারা হরমুজ প্রণালীকে ব্যবহার করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে কম্পন ধরিয়ে দেবে। আজ সেই সঙ্কেত বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আধুনিক যুদ্ধকৌশল

১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ বিশ্ব দেখেছিল। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বর্তমানে ইরানের অস্ত্রাগারে রয়েছে সস্তা কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল বহর। এর মাধ্যমে তারা কোনো প্রকার জলজ মাইন ব্যবহার না করেই সাগরের বিশাল এলাকা জুড়ে নৌচলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘ইরান সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে, এটি একটি অনস্বীকার্য সত্য। তাই তারা সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধের পরিবর্তে এই যুদ্ধকে সময় ও স্থানের প্রেক্ষাপটে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। ইরান যদি বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করতে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই পিছু হটতে হবে।

‘মোজাইক’ ডকট্রিন ও নেতৃত্বে পরিবর্তন

ইরানের এই প্রতিরোধ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় দিক হলো তাদের মোজাইক সামরিক নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থা ভেঙে গেলেও আঞ্চলিক ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কিন্তু তার মৃত্যুতে ইরানের সামরিক তৎপরতা থেমে যায়নি।

সূত্র মতে, খামেনির অবর্তমানে দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও সাবেক গার্ডস কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি যুদ্ধের সমন্বয় করছেন। ইরানের ৪৭ বছরের ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ইসলামি রেভুলিউশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) এখন এই বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবহার করে আক্রমণ পরিচালনা করছে।

ওয়াশিংটনের কৌশলগত ব্যর্থতা

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল আইজেনস্টাটের মতে, ইরান সামান্য সামরিক বিনিয়োগে বিশ্বজুড়ে বিশাল প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে। তিনি মনে করেন, এটিই হলো অপ্রতিসম যুদ্ধের চূড়ান্ত উদাহরণ। ইরানের লক্ষ্য হলো বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তিনি যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

অন্য দিকে বিশ্লেষক আলী ভায়েজের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ড্রোন প্রযুক্তির প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর ওপর এর আঘাত হানার সক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা পূর্বাভাসে ঘাটতি ছিল। এর ফলে ইরাক ও আফগানিস্তানের পর এটি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান।

ইরানের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য হলো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। তবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ওয়াশিংটনকে একটি শিক্ষা দেয়া- যে সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব নয়। তেহরান বাজি ধরেছে যে, তারা মার্কিন সামরিক শক্তির চেয়ে দীর্ঘ সময় এই যুদ্ধ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথকে রুদ্ধ করে দিয়ে ইরান এখন কেবল ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন কোন পথে হাঁটবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ববাজারের ভবিষ্যৎ।