শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোর বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন

সাড়ে ২১ বছরে খালি হয়েছে ২৭৭ মায়ের বুক

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে উঠা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে কি না- সে প্রশ্ন সামনে আসছে। একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় এমন প্রশ্ন উঠছে। গত সাড়ে ২১ বছরে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে ২৭৭ জন মায়ের বুক খালি হয়েছে। আর আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ইয়ার্ডগুলো কি কাগুজে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে? গ্রিন সার্টিফিকেট অর্জন করলেও প্রতিদিনের বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তরিকতার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

মৃত্যু থামছে না কেন : জাহাজভাঙা শিল্প নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ইপসা বলছে, ২০০৫ সাল থেকে চলতি বছরের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে ২৭৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং এক হাজার ৫৪০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরেই নিহত হয়েছেন এ পর্যন্ত ১২ শ্রমিক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু একটি সার্টিফিকেট বা ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ ঘোষণা করলেই শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। দুর্ঘটনা কমাতে হলে প্রতিদিনের কাজে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, গ্যাস পরীক্ষা, পারমিট টু ওয়ার্ক সিস্টেম, প্রশিক্ষণ, পিপিই, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে নিয়ম ও নীতিমালা আছে; কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো- এসব নিয়ম মাঠপর্যায়ে কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন ও মনিটর করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ দ্রুত কাটার চাপ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, ঝুঁকি মূল্যায়নের দুর্বলতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

শ্রমিক সুরক্ষার দায় কার : ইয়ার্ডগুলোতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই শ্রমিকদের পরিবারকে কিছু ক্ষতিপূরণ প্রদানই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। শ্রমিক সুরক্ষার দায় কেউ নেয় না। সরকারি সংস্থাগুলো যেমনি তদারকির গাফিলতি স্বীকার করে না, তেমনি মালিকপক্ষও দায় স্বীকার করে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিক নিরাপত্তার দায় মালিকের এবং ইয়ার্ড মেনেজমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারি সংস্থাসহ সবার- এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। তবে প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব ইয়ার্ড মালিক ও ব্যবস্থাপনার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কানো জাহাজের ট্যাংক, কার্গো স্পেস বা বন্ধ জায়গায় শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাস পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একবার পরীক্ষা করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাজের আগে প্রয়োজন অনুযায়ী আবার পরীক্ষা এবং কাজ চলাকালীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

গ্যাস ডিটেক্টর ও পিপিই ব্যবহার করা নিয়ে সন্দেহ : সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, গ্যাস ডিটেক্টর ও পিপিই থাকা এবং সেগুলো বাস্তবে ব্যবহার করা- দু’টি এক জিনিস নয়। ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত ও ক্যালিব্রেটেড গ্যাস ডিটেক্টর আছে কি না, কাজ শুরুর আগে সেগুলো দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, পরীক্ষার রেকর্ড আছে কি না এবং শ্রমিকরা সঠিক পিপিই পরে কাজে প্রবেশ করেছেন কি না। একইভাবে পিপিই শুধু সরবরাহ করলেই হবে না; শ্রমিক সেটি ব্যবহার করছেন কি না, সুপারভাইজার তা নিশ্চিত করছেন কি না এবং নিয়ম ভঙ্গ হলে কাজ বন্ধ করা হচ্ছে কি না-এসবও দেখতে হবে।

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে হংকং কনভেনশন : জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বা শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে হংকং কনভেনশনে (এইচকেসি ২০০৯) বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ। গত বছর বাংলাদেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। এর আগে থেকেই আমাদের দেশের বিভিন্ন ইয়ার্ড কনভেনশনটি অনুসরণ করে নিজেদের ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে বলে আসছিল।

হংকং কনভেনশন মূলত শ্রমিকের নিরাপত্তা; পরিবেশ সুরক্ষা; হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা ও সঠিক ডকুমেন্টেশন এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কাজ করে। আমাদের দেশের ইয়ার্ডগুলোতে কনভেনশন কাগজে কলমে অনুসরণের কথা বললেও বাস্তবে এর যথাযথ প্রয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যায়। তা ছাড়া বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিনা পরিদর্শনে বা নামমাত্র পরিদর্শনে সনদ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।

সেফটি সার্টিফিকেট প্রদান প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ : খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ইয়ার্ড গ্রিন সার্টিফিকেট বা আন্তর্জাতিক মানের অনুমোদন পেলেই ধরে নেয়া যাবে না যে সেখানে পরবর্তী প্রতিটি দিন ১০০ শতাংশ নিরাপদ। সার্টিফিকেশনের পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং ও কমপ্লায়েন্স যাচাই প্রয়োজন। সার্টিফিকেট দেয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে যে জাহাজটি কাটার সময় ৯ জনের প্রাণহানি হলো- সেটির সনদ প্রদান প্রক্রিয়া নিয়ে ইতোমধ্যে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। নামমাত্র পরিদর্শনেই জাহাজটিকে নিরাপদ সনদ দেয়া হয়েছে- এমন অভিযোগও রয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা ইপসার হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন নয়া দিগন্তকে বলেন, শিপ রিসাইক্লিং খাতে সমস্যা সার্টিফিকেটের অভাব নয়; মূল প্রশ্ন হলো সার্টিফিকেটের শর্তগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে। তিনি বলেন, একটি দুর্ঘটনার পর শুধু শ্রমিক বা সুপারভাইজারকে দায়ী করলে হবে না। দেখতে হবে- ঝুঁকি আগে শনাক্ত হয়েছিল কি না, গ্যাস পরীক্ষা হয়েছিল কি না, নিরাপদ কাজের অনুমতি দেয়া হয়েছিল কি না, পিপিই ও গ্যাস ডিটেকশন ব্যবহার হয়েছিল কি না, প্রশিক্ষণ ছিল কি না, উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কনসালট্যান্ট ও কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন কি না।

ফেরদৌস স্টিলের কার্যক্রম স্থগিত : জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর পর ফেরদৌস স্টিলের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি এখনো প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করতে পারেনি। নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে যাতে আর কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্যই আপাতত কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

কাজ শুরু করতে পারেনি তদন্ত কমিটি : ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও তিনটি তদন্ত কমিটির কেউ-ই জাহাজটির কাছে ঘেঁষতে পারেননি এখনো ঝুঁকি বিদ্যমান থাকায়। তবে গতকাল সোমবার বুয়েটের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো: ইয়াসির আরাফাত খানের নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ৮ সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার জানিয়েছেন, গ্যাসের তীব্রতা ও বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকায় তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি, যার কারণে একটি বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়।

বিএসআরবি মহাপরিচালকের বক্তব্য : বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক (ডিজি) এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার নয়া দিগন্তকে বলেন, জাহাজ কাটার অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেকগুলো এজেন্সি কাজ করে। একটা জাহাজ বিচিং যখন হয়, চারটি এজেন্সি এটা তদন্ত করে। ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক পরিদফতর, নেভী এবং পরিবেশ অধিদফতর। নেভী নেভিগেশন ইকুইপমেন্ট নিয়ে চলে যায়, ফায়ার সার্ভিস দেখে কাটিং বা কোনো ধরনের হ্যাজার্ড ঝুঁকি আছে কি না, বিস্ফোরক অধিদফতর গ্যাস থেকে শুরু করে নানা ধরনের উপাদান চেক করে, পরিবেশ অধিদফতর পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে। চারটি বিভাগ কম্বাইন্ডলি যখন এনওসি দেয় তখন আমরা কাটিংয়ের পারমিশন দেই।

তিনি বলেন, জাহাজটি গত এক বছর ধরে কাটতেছে ধীরে ধীরে। কেটে কেটে নিচে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে প্রসেসে জাহাজ বিল্ড করে এর ঠিক উল্টো প্রসেসে জাহাজ কাটা হয়। প্রতিদিন কাজ করার আগেই আগের দিন প্লান করে যেকোনো সেকশন কাটা হবে এবং সেখানে কি ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে এবং সেটি কিভাবে সমাধান করা যাবে। একেক পার্ট কাটার সময় একেক ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয়। তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিনও ইয়ার্ডটির ওরা রেকি করতেই মূলত গিয়েছিল। তবে তারা গ্যাস ডিটেক্টর দিয়ে আগে পরীক্ষা করার কথা থাকলেও সেটি করেনি বলে জানান।

আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, হংকং কনভেনশন অনুযায়ীই আমাদের প্রতিটি ইয়ার্ড চলে। এখানে বাইন্ডিংসের পার্ট চারটি- যে ফ্যাসিলিটিতে কাটা হবে সেটার কমপ্লায়েন্স, যে লোকগুলো কাজ করবে তাদের কমপ্লায়েন্স, যেসব ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করতে হবে সেসব নেসেচারি ইকুইপমেন্ট বা পিপিইগুলো আছে কি না এবং যখন একটা নতুন শিপ আসবে শিপ রিসাইক্লিং প্লান তথা একটা অয়েল ট্যাংকারের ম্যানেজমেন্ট এক রকম, কার্গো শিপের ম্যানেজমেন্ট এক রকম এ ধরনের প্লান। প্রতি বছরই প্রত্যেকটা ইয়ার্ডকে অডিট করা হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন সোসাইটির মাধ্যমে।

জাহাজের ভেতরে সম্ভাব্য কি থাকতে পারে আগে থেকেই একটা প্রস্তুতি থাকে। ১৯৮২ সালের পর থেকে গ্যাস লিকেজে আজ পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি হয়নি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে। আগুন ধরেছে, ছিটকে পড়ে মারা গেছে, ইলেকট্রিফাইড হয়েছে; কিন্তু গ্যাস লিকেজে আজ পর্যন্ত মারা যায়নি। এটা একেবারেই অপ্রচলিত একটা কেস হয়েছে।