বাংলাদেশ ভারতে না গেলে এবং সূচি বদলাতে হলে ভারতকে মোটা অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। সেই ক্ষতির সম্ভাব্য তথ্য জানিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কলকাতার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার অনলাইন। বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ হতো ৬৩ হাজার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে। আর মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে ৩৩ হাজার। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের ৪টি ম্যাচে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টিকিট বিক্রির সম্ভাবনা ছিল। বাংলাদেশের ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম রাখা হয়েছে ১০০ টাকা থেকে ৩০০ রুপির মধ্যে। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, টিকিটের মালিকানা আইসিসি বিজনেস কর্পোরেশনের। যেহেতু ভারতীয় বোর্ড কেবল বিশ্বকাপের আয়োজক, ফলে টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ তারা পাবে না। সে কারণে টিকিট বিক্রির ক্ষতি বোর্ডের গায়ে তেমন লাগবে না।
তবে বিসিসিআইর মূল ক্ষতি হতে পারে ম্যাচ-ডে সারপ্লাস (উদ্বৃত্ত আয়), স্থানীয় স্পনসরশিপ এবং হসপিটালিটি ডিমান্ড (ভিআইপি বক্স) থেকে। আনন্দবাজার সম্ভাব্য তিনটি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ্য করে জানিয়েছে, টিকিট বিক্রি বাবদ সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১০ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকা। (যদি ৬০-৯০ শতাংশ দর্শক উপস্থিতি এবং টিকিটের গড় দাম ৫০০-১৫০০ রুপি ধরা হয়)।
মোস্তাফিজ ইস্যুতে এখন এক কাতারে দাঁড়িয়ে পুরো বাংলাদেশ। আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স হঠাৎ করেই মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে। ক্রিকেট ভক্ত, সাবেক খেলোয়াড়, সংগঠক, কেউই এই সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। কারণ মোস্তাফিজ কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি বাংলাদেশের গর্ব, দেশের ক্রিকেটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। এই মুহূর্তে মোস্তাফিজ একা নন। তিনি দেশের আবেগ, আত্মসম্মান আর ন্যায্যতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ আবারো প্রমাণ করল, প্রয়োজনে তারা এক কণ্ঠে কথা বলতে জানে।
ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সদর দফতরে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠিয়েছে। ক্রীড়া উপদেষ্টা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং স্পষ্ট করে বলেছেন, খেলাধুলার মাঠে রাজনীতি কিংবা বৈষম্যের কোনো জায়গা নেই। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা মানে বড় ধরনের ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে আরো বড় পরিসরে। যে দেশ একজন মোস্তাফিজকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, সেখানে আসন্ন বিশ্বকাপে পুরো বাংলাদেশ দল, বাংলাদেশী সমর্থক এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা হবে? এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে ভারত গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে তারা আগ্রহী নয়। বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কা অথবা ভারত ছাড়া অন্য কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আইসিসি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের চিঠি আমলে নিয়েছে।
বিষয়টি নতুন করে বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বকাপের সূচি পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের সবগুলো ম্যাচই ছিল ভারতের মাটিতে। আইসিসির বর্তমান প্রধান জয় শাহ, যিনি একইসাথে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরও প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় কী ভূমিকা রাখেন, সেদিকেও তাকিয়ে আছে বিশ্ব ক্রিকেট।
এ দিকে দেশের ভেতরেও প্রতিবাদের ভাষা আরো দৃশ্যমান। তথ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে, যা এই ইস্যুতে রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। শুধু ক্রিকেট বোর্ড নয়, ফুটবল অঙ্গন থেকেও এসেছে সমর্থনের বার্তা। বাফুফে সভাপতি নিজে মোস্তাফিজকে জানিয়ে দিয়েছেন-চিন্তার কোনো কারণ নেই, পুরো বাংলাদেশ তার পাশে আছে।
আইপিএলের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়কে মৌসুম শুরুর এত আগে, ফিটনেস বা শৃঙ্খলাজনিত কারণ ছাড়া বাদ দেয়ার নজির নেই। ফলে বিষয়টি শুধু ক্রিকেটীয় নয়, কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ার কথা টি-২০ বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্ট শুরুর আর মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময় বাকি থাকায় সূচি বদলানো আইসিসির জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জ বৈকি। বাংলাদেশের অনুরোধ, ভারতের অবস্থান এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি, সবকিছু মিলিয়ে এখন শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আইসিসিকেই।
সম্প্রচার ও প্রচার বন্ধের নির্দেশনা
মোস্তাফিজ ইস্যুতে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) সংক্রান্ত সব খেলা ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার বা প্রচার বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে জারি করা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
উপসচিব স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট করেছে, দেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবস্থান থেকে তারা সরে আসবে না। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
মোস্তাফিজ বিনদাস আছে : সোহান
রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক নুরুল হাসান বলেন, ‘মোস্তাফিজ বিনদাস আছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে, খারাপ লাগা তো থাকতেই পারে। অবশ্য তার বিষয়টি যেন আলাদা। কোনো ভাবান্তর নেই। সে মনে করে, ইটস ফাইন (ঠিক আছে)।’
তার প্রমাণ মিলেছে বিপিএলে ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে ম্যাচেও। শেষ তিন ওভারে ঢাকার প্রয়োজন ছিল ২৫ রান। সেখানে ১৮ ও ২০তম ওভারে মাত্র ৬ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন। সোহানের ভাষায়, ‘শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস ছিল, মোস্তাফিজ আছে। অবশ্যই ও বিশ্বমানের বোলার, আর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ওর সেরাটাই বেরিয়ে আসে।’
নতুন সূচি তৈরি করছে আইসিসি
আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানায় বিসিবি। বাংলাদেশের বার্তা পেয়ে ম্যাচগুলো সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে বলে বেশ কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। ইতোমধ্যে নতুন সূচি তৈরি করতেও তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে ভারত। তাদের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয় শাহর নির্দেশে পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন সূচি তৈরির কাজ শুরু করেছে আইসিসি। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে ভেনু ও আবাসনের ব্যবস্থা করা একটু কঠিন হতে পারে।



