রোজার শুরুতেই চড়া নিত্যপণ্যের বাজার

লেবুর হালি ১৬০ শসা-বেগুনে সেঞ্চুরি পার

ইফতারের অপরিহার্য উপকরণ লেবু, শসা ও বেগুনের দাম ‘সেঞ্চুরি’ ছুঁয়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়েছে, ফলে রোজার প্রস্তুতির সাথে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ব্যয়ের উদ্বেগও।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

রমজান শুরুর প্রাক্কালে রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। ইফতারের অপরিহার্য উপকরণ লেবু, শসা ও বেগুনের দাম ‘সেঞ্চুরি’ ছুঁয়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়েছে, ফলে রোজার প্রস্তুতির সাথে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ব্যয়ের উদ্বেগও।

রাজধানীর কাওরান বাজার, ইব্রাহিমপুর কাঁচাবাজার, শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়া এলাকার বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, রোজা সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ক্রেতাদের ভিড় বাড়লেও দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং অধিকাংশ পণ্যের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় আরো বেড়েছে।

বাজারে লেবু বিক্রি হচ্ছে আকার ও মানভেদে ৬০ থেকে ১৪০ টাকা হালি। তবে বড় আকারের একটি লেবু পাইকারিতে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় খুচরায় সেই লেবুর হালি দাঁড়াচ্ছে ১৬০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কম এবং চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

এ দিকে শসা কেজি-প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকায়। দেশী শসার দাম ১৪০ টাকা এবং হাইব্রিড ১০০ টাকা কেজি। বাজারে শসার সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দাম বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ক্ষিরা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে। ইফতার-সামগ্রী তৈরিতে বাজারে বেগুনের চাহিদা বেড়ে যায়। বেগুনের সরবরাহ মোটামুটি থাকলেও দাম কমেনি। কেজি-প্রতি ১০০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বেগুন।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, রোজাকে কেন্দ্র করে তরমুজের চাহিদাও বেড়েছে। বর্তমানে কেজি-প্রতি ৬৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে তরমুজ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজ পুরোপুরি বাজারে এলে দাম কিছুটা কমতে পারে।

ইফতারের অন্যতম প্রধান উপকরণ খেজুরের বাজারেও বাড়তি চাপ লক্ষ করা গেছে। সর্বনিম্ন ৩৫০ টাকা কেজি দরে খেজুর বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের খেজুরের দাম প্রকারভেদে দুই হাজার টাকারও বেশি। তবে ৫০০ থেকে ৭০০ এবং এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরের খেজুরের চাহিদাই বেশি। আমদানিনির্ভর এই পণ্যের ক্ষেত্রে ডলার মূল্য ও আমদানি ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

ফলমূলের বাজারেও স্বস্তি নেই। নতুন ওঠা স্ট্রবেরি কেজি-প্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পেঁপে ১৪০ টাকা কেজি, বাঙ্গি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পিস এবং পেয়ারা ১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য ফলের দামও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি।

সবজির পাশাপাশি মসলাজাতীয় পণ্যেও ঊর্ধ্বগতি। পাইকারিতে পেঁয়াজ ২৭০ টাকা পাল্লা, যা কেজিতে প্রায় ৫৪ টাকা পড়ে। খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। রসুন পাইকারিতে ২০০ এবং আদা ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আলু পাইকারিতে ৯০ টাকা পাল্লা হলেও খুচরায় দাম বেশি।

রোজার অপরিহার্য পণ্য ছোলা বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৮০ থেকে ১১০ টাকায়। চিনি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, মুড়ি ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি এবং সয়াবিন তেল লিটার-প্রতি ১৯৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবমিলিয়ে রোজার বাজারে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই বাড়তি।

মিরপুর-৬ বাজারে গৃহিণী উম্মে হাবিবা বলেন, রোজা এলেই বাজারে আগুন লাগে। লেবু, শসা, বেগুনের দাম শুনে মাথা ঘুরে যায়। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাওরান বাজারে ফল কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী দিদার বলেন, রমজান সামনে রেখে কিছু ফল কিনতে এসেছি; কিন্তু দাম এত বেশি যে প্রয়োজনের অর্ধেকও কেনা যাচ্ছে না। তরমুজের কেজি ৯০ টাকা এভাবে চললে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে।

এ দিকে বিক্রেতারা বলছেন, পরিবহন ব্যয়, আড়তদারি কমিশন ও সংরক্ষণ খরচ বাড়ায় খুচরায় তার প্রভাব পড়ছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, রোজাকে ঘিরে একটি শ্রেণী অতি মুনাফার আশায় দাম বাড়িয়ে দেয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রমজানকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই চাহিদা বাড়ে; কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ও দুর্বল বাজার তদারকির কারণে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। নিয়মিত মনিটরিং ও বাজারে সরাসরি অভিযান জোরদার করা না হলে এই প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন।

সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর পক্ষ থেকে বাজার তদারকির কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। তারা বলছেন, কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রোজার পুরো মাসজুড়েই মূল্যচাপ অব্যাহত থাকবে।