যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আরো পাল্টাপাল্টি হামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ইরানের ওপর নতুন করে ব্যাপক বিমান হামলা করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী, যার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জানিয়েছে যে এই আগ্রাসনের ফলে গত কয়েক মাসের সমস্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে। মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন আক্রমণ ও ইরানের পাল্টা আঘাতের ফলে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি টিকিয়ে রাখার চাপ আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও অসামরিক নাবিকদের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করতে এবং ইরানি বাহিনীর আক্রমণ করার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে রোববার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৯টা থেকে এই নতুন বিমান হামলা শুরু করা হয়েছে।

সেন্টকম আরো জানায় যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশনায় ইরানি বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই হামলার প্রসঙ্গে বলেছেন যে ‘আমরা তাদের চরম মার দিচ্ছি’।

আমেরিকার এই আক্রমণের জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জর্দানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে তারা আকাশেই ইরানের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে ভূপাতিত করেছে। মিডল ইস্ট আই জানায়, কুয়েতের অভ্যন্তরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি সারফেস-টু-সারফেস বা ভূখণ্ড থেকে ভূখণ্ডে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তীব্র সামরিক হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। গতকাল সোমবার মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ব্যাপক যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানি এই বিশেষ এলিট বাহিনীর পক্ষ থেকে চালানো এই বিধ্বংসী অভিযানের খবরটি মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে। আইআরজিসির প্রধান সামরিক কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষ বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে তাদের এই সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত আক্রমণের ফলে ওই মার্কিন ঘাঁটিতে থাকা দু’টি অত্যন্ত আধুনিক ‘হাইমার্স’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা বা লঞ্চারে তাৎক্ষণিকভাবে দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। একইসাথে সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ভর্তি করে রাখা বিশাল গুদামগুলোও এই হামলায় আক্রান্ত হয়েছে এবং মার্কিন বাহিনীর এই সমস্ত যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক রসদ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনীও সোমবার জানিয়েছে যে তারা তাদের আকাশসীমায় শত্রুভাবাপন্ন উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দুই পক্ষের এই হামলা ও পাল্টা হামলা সাম্প্রতিক সময়ে গতি এবং পরিধির দিক থেকে অনেক গুণ বেড়ে গেছে। গত শনিবার রাতে মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রায় একশত চল্লিশটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছিল এবং সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী চলতি সপ্তাহে তিন রাতে তারা ইরানের তিন শতাধিক সামরিক অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। এই নতুন সহিংসতার জেরে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে যে এত উত্তেজনার মধ্যেও কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ এই নৌপথ দিয়ে তাদের চলাচল অব্যাহত রেখেছে। এর আগে রোববার ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমায় আঘাত হানে। কাতার এই শান্তি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও গত এপ্রিলের পর এই প্রথম সেখানে হামলা হলো।

অন্যদিকে মে মাসের পর এই প্রথম সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি সমৃদ্ধ বন্দর নগরী সিরিক, বন্দর আব্বাস এবং কাছাকাছি কুশেম দ্বীপে মার্কিন হামলায় ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকার এই নতুন দফার হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেছে যে এই আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাস এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গত কয়েক মাসে নেয়া সমস্ত পদক্ষেপকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিয়েছে। তেহরান আরো অভিযোগ করেছে যে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ করে মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলকে বিঘিœত করছে এবং এই অঞ্চলে পুনরায় নিরাপত্তাহীনতা ডেকে এনেছে।

ইরানের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়েছে যে হরমুজ প্রণালী ও যাতায়াত রুট ব্যবস্থাপনার বিষয়ে গত শনিবার ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা কোনো ফলাফলে পৌঁছাতে পারেনি, কারণ ওমান সরকারের ওপর আমেরিকার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য চাপ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তির প্রতিশ্রুতি পালনের আহ্বান জানিয়েছে ইরান। একইসাথে ওয়াশিংটন যদি চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে তেহরানও আর ওই সমঝোতা মেনে চলবে না বলে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে। গতকাল তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই। তিনি বলেন, প্রতিটি আলোচনায় ইরান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেশের জনগণের স্বার্থ ও উদ্বেগকে প্রাধান্য দিয়ে অংশ নিয়েছে। কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর পর ইরান সবসময় সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার সাথে নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র কখনোই প্রথম পক্ষ হয়ে চুক্তি ভঙ্গ করেনি। বাকাই আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারে, তাহলে ইরানও তাদের সাথে স্বাক্ষরিত মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং মেনে চলবে না। তিনি জানান, অতীতে যখনই অপর পক্ষ তাদের দায়িত্ব পালন করেনি, তখন ইরানও নিজের প্রতিশ্রুতি পালন করা থেকে বিরত থেকেছে। ভবিষ্যতেও একই নীতি অনুসরণ করবে তেহরান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করলেও আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে ইরানের শীর্ষ পরমাণু আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন যে ‘একতরফা চুক্তির দিন এখন শেষ। আমরা আপনাদের বলেছিলাম : কথা রাখুন নতুবা মূল্য দিন। বাস্তবতা এখন দরজায় কড়া নাড়ছে’।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরাইলের শুরু করা এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য কংগ্রেস নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এই নতুন সঙ্ঘাতের জেরে গতকাল সোমবার সকালে টোকিওর বাজারে লেনদেন শুরু হতেই অপরিশোধিত তেলের দাম সাড়ে তিন শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি চুয়াত্তর ডলারের ওপরে উঠেছে।

ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে শুল্ক আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করছে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে চলাচল না করতে সতর্ক করেছে। ইরানের নবগঠিত পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি জানিয়েছে যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বেআইনি তৎপরতার কারণে বর্তমানে এই নৌপথ দিয়ে যান চলাচল সম্ভব নয় এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার নতুন করে পারমিট দেয়া হবে। তবে আমেরিকা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করতে তাদের নৌবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং ওমানের কাছাকাছি একটি বর্ধিত দক্ষিণ রুট দিয়ে এখনো দুইমুখী জাহাজ চলাচল সচল রয়েছে।