রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি আয় বৃদ্ধিতে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগে যে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে তা অর্থনীতির সামগ্রিক গতিশীলতাকে শঙ্কায় ফেলেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা ও জ্বালানি সঙ্কট সব মিলিয়েই বিনিয়োগের এই ধীরগতির পেছনে কাজ করছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির অনুপাতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি নেমে আসে প্রায় ২২ শতাংশে, যা গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়। কয়েক বছর আগেও এই হার ২৪ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। একই সময়ে মোট বিনিয়োগের হারও কমে এসেছে, যা অর্থনীতিতে নতুন মূলধন গঠনের গতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন বাড়ে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেলেও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রাক্কলনে এ হার ২৪ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশে অবস্থান করায় নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তাদের মতে, এ হার এক অঙ্কে না নামানো গেলে শিল্প খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসা কঠিন হবে। একইসাথে ব্যাংকিং খাতে তারল্যসঙ্কট ও খেলাপি ঋণের চাপ বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট নিট বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) দাঁড়িয়েছে ১.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট এফডিআই এসেছে ৩১৫.০৯ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের তুলনায় ২০২ শতাংশ বেশি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এই স্থবিরতার সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। নির্বাচনী সময়কে ঘিরে নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে সংশয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘অপেক্ষা ও দেখার’ মনোভাব সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান কার্যক্রম সীমিত রাখছেন। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অনিশ্চয়তা থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়, আর ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগ কমে যায় এটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক আচরণ।

এ দিকে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সরাসরি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে। শুধু দেশীয় নয়, বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এমন পরিবেশে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহেও ধীরগতি দেখা যায়, যা প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতার আরেকটি বড় কারণ আর্থিক খাতের দুর্বলতা। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর সক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে। ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে সতর্ক হয়ে উঠেছে, ফলে উদ্যোক্তারা সহজে অর্থায়ন পাচ্ছেন না। একই সাথে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৬ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনি¤œ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণপ্রবাহ কমে গেলে বিনিয়োগও কমে এটি সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।

দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা বলেছেন, নীতিগত অস্থিরতাও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। করনীতি, আমদানি নীতি, বিনিময় হার এবং বিভিন্ন প্রণোদনা কাঠামোয় ঘন ঘন পরিবর্তন ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন করে তুলেছে। তারা নতুন সুবিধা নয় বরং নীতির ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা চান। একটি স্থিতিশীল নীতি পরিবেশ বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ঝুঁকি কম থাকে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সহজ হয়।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সমস্যাও বিনিয়োগ স্থবিরতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি উৎপাদন ব্যাহত করছে, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং লাভের সম্ভাবনা কমছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না। এতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই কমে যাচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল না হলে শিল্পায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি খাত বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সৃষ্টি করে। ফলে এই খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে শ্রমবাজারেও তার প্রভাব পড়ে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। একই সাথে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও কমে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি তিন থেকে চার শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেক কম।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব, যদি সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা হয়। প্রথমত. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অর্থনৈতিক নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত. আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত. জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত. নীতিগত স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ আস্থা ছাড়া বিনিয়োগ হয় না, আর বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে পারলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আবার গতি পেতে পারে এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।