যত্রতত্র আবর্জনার কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়েছে ঢাকা। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান, অলিগলি, ব্যস্ততম রাস্তার মোড়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র সর্বত্রই দেখা মিলছে ময়লার স্তূপ। খোলা জায়গায় ফেলা বর্জ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। উৎকট দুর্গন্ধে হাঁসফাঁস পথচারীদের নাক চেপে চলাচল করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের এই কষ্টে নজর নেই সিটি করপোরেশনের।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের ময়লা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। এর মাধ্যমে বায়ু ও পানি দূষণ, দুর্গন্ধ সৃষ্টি এবং জনস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য- যত্রতত্র ময়লা ফেলা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে অব্যবস্থাপনা এর মূল কারণ; যা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বায়ুদূষণ এবং পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাচ্ছে।
আর নগরবাসী বলছেন, শহরের এমন অবস্থা নতুন নয়। সিটি করপোরেশন এলাকাভিত্তিক ময়লার প্রধান ডাম্পিং স্টেশন ঠিক করলেও, পাড়ার অলিগলিতে বসবাসকারীদের জন্য বাসাবাড়ির ময়লা রাখার স্থান নির্ধারণ করা হয়নি। তাই মূল ডাম্পিং স্টেশনে ময়লা নেয়ার আগে যে যেখানে পারছেন সেখানেই ময়লা ফেলছেন। এতে অনেক স্থানে জমা হওয়া ময়লা আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুর্গন্ধের সৃষ্টি ও পরিবেশ নষ্ট করছে। যদিও সিটি করপোরেশন বলছে, তারা এলাকাভিত্তিক ময়লা সংগ্রহে গাড়ি ঠিক করে দিয়েছেন। কিন্তু অনিয়ম ও নাগরিকদের অসতর্কতা পরিবেশ বিপির্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। দুর্গন্ধে বমি আসার উপক্রম। নাকে রুমাল চেপে চলছেন পথচারীরা। অন্য দিকে মুগদা-মাণ্ডা, মতিঝিল, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ ধোলাইখাল, ফকিরাপুল, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, জুরাইন, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার ও তেজগাঁও এলাকায় কিছু জায়গায় একই অবস্থা। ছড়ানো ছিটানো অবর্জনায় বিরক্ত মানুষ। এলাকাবাসীর ভাষ্য, সব ময়লা একসাথে জমানোর জন্য ডাম্পিং স্টেশন থাকলেও বাসাবাড়ির আশপাশে ময়লা ফেলার কোনো নির্ধারিত স্থান নেই। তাই যে যার মতো করে ইচ্ছানুযায়ী ময়লা ফেলছেন। আর তা সিটি করপোরেশন পরিষ্কার না করায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
অন্য দিকে এখন শীতকাল থাকায় কিছুটা রক্ষা হলেও বর্ষা মওসুমে ময়লা রাস্তায় ছড়িয়ে চলাচলে অসুবিধা হয়। কারণ এক দিকে রাজধানীতে প্রয়োজনের তুলনায় নালা-নর্দমা অর্ধেকেরও কম। অপর দিকে যা আছে তাও ময়লা আবর্জনা আর পলিথিনে বন্ধ হয়ে আছে। ফলে বৃষ্টি হলে ময়লা ড্রেন উপচে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. মোহাম্মদ আবদুর রব নয়া দিগন্তকে বলেন, এমনিতেই বর্তমান অবস্থায় ঢাকা বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে। যত্রতত্র ময়লা ফেলা, সংগ্রহে অনিয়ম এবং অপরিকল্পিত ডাম্পিং পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। ময়লা থেকে পানি, মাটি ও বাতাস দূষিত হচ্ছে। কারণ খোলা জায়গায় ময়লার স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে- যা বায়ুদূষণ বাড়ায়। অন্য দিকে ড্রেনে জমা আবর্জনা পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে জলাবদ্ধতা ও পানি দূষণ হয়- যা রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটায় এবং নাগরিক জীবনকে প্রভাবিত করে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, তারা নির্ধারিত ডাম্পিং নিয়মিত পরিষ্কার করেন। এতে করে এলাকায় অনেক স্থানে ময়লার স্তূপ থাকলে তা তাদের অজান্তে হয়। ফলে সিটি করপোরেশন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পরিষ্কার করতে পারে না। অন্য দিকে ময়লা পরিষ্কারে এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নকর্মীরা গাড়ি দিয়ে ময়লা নিয়ে আসে। তারা এ বিষয়গুলো খেয়াল না রাখলে সিটি করপোরেশন কিভাবে নজর রাখবে। তার ভাষ্য, মানুষকেও সচেতন হতে হবে। মানুষ রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল ফেলে। এতে ড্রেনগুলো প্লাস্টিকের বর্জ্যে ভরে যায়। নিয়মিত পরিষ্কার করেও এ থেকে রক্ষা মিলছে না। এসব কারণে পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে।



