চট্টগ্রাম ব্যুরো
দক্ষিণ চট্টগ্রামের দুই উপজেলায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন সাতকানিয়ায় কর্মরত মনছুর আলম নামে এক ‘দাপুটে’ ইউপি সচিব। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এবং পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পৃথকভাবে তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে অফিসিয়াল নোট দিয়েছেন। তারপরও ওই ইউপি সচিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাতকানিয়ার ১৩ নম্বর বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনছুর আলমের বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত ৪ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে অফিসিয়াল নোট প্রেরণ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান। ওই সরকারি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মনছুর আলম সরকারি টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেছেন এবং উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এতে বলা হয়, তিনি হাটবাজার তহবিল প্রকল্পের ভ্যাট বাবদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা ও আয়কর বাবদ ৬০ হাজার টাকা সরকারি কোডে জমা না দিয়ে ইউএনও’র স্বাক্ষর জাল করে পূবালী ব্যাংক, শান্তির হাট শাখায় একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা করে উত্তোলন করতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংক, কেরানীহাট শাখা থেকে টাকা ছাড় করার অনুমতি চাওয়া হলে সাথে সাথে চেকের টাকা উত্তোলন বন্ধ করা হয়।
একই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের প্রথম কিস্তির পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার ৬০০ টাকা ও দ্বিতীয় কিস্তির পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার ৬০০ টাকা বিজিসিসি সভায় অনুমোদন করা হয় এবং প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করা হয়। ওই তহবিলের টাকা তোলার জন্য ইউএনও’র মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালকের (ডিডিএলজি) অনুমোদন গ্রহণ করতে হয়। ওই অনুমোদন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে দাখিল করে প্রকল্পভিত্তিক টাকা উত্তোলন করতে হয়। কিন্তু অভিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডিডিএলজির অনুমোদন ছাড়া সোনালী ব্যাংক, কোর্ট হিল শাখা চট্টগ্রাম থেকে সমদুয় টাকা উত্তোলন করেছেন মর্মে সোনালী ব্যাংক, সাতকানিয়া শাখার ম্যানেজার ইউএনওকে অবহিত করেছেন।
এ দিকে একই ব্যক্তি পটিয়া উপজেলার বড়লিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হিসেবে কর্মরত থাকাকালেও নানা আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি এখন পর্যন্ত বড়লিয়া ইউপির দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি বলে পটিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার গত ২৫ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে অবহিতকরণ পত্র দিয়েছেন। ওই পত্রের সাথে সংযুক্ত বড়লিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার অফিস আদেশে গত ২৭/০৮/২০২৫ তারিখে বড়লিয়া ইউপির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনছুুর আলমকে বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ, সাতকানিয়াতে বদলি করা হয়। তার স্থলে আবদুল মালেক (বড়লিয়া ইউনিয়ন পরিষদে) প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।
নতুন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে আগের সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া নিয়ম থাকলেও মনছুুর আলম এখনো পর্যন্ত কোনো রকম দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে কালক্ষেপণ করছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে অনলাইনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হয়। অনলাইনে সরকারি নির্ধারিত ফি প্রতিটি প্রশাসনিক কর্মকর্তার আইডিতে জমা হয়। প্রতি মাসের প্রথম সাত কার্যদিবসের মধ্যে ওই টাকা চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করার নিয়ম চালু আছে। কিন্তু অত্র ইউনিয়নের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইডি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, সরকারি টাকা নিয়ম মোতাবেক জমা করা হয়নি। সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে একবার টাকা জমা করে ওই একই চালান কপি বারবার আপলোড দিয়ে সচিব আইডিতে জমাকৃত টাকার ব্যালেন্স ০ (শূন্য) করা হয়েছে। বর্তমানে তার আইডিতে জমাকৃত চার লাখ পাঁচ হাজার ৭০০ টাকা তিনি সরকারি কোষাগারে জমা করেননি।
এ ছাড়া চিঠিতে বলা হয়েছে, এই ইউনিয়নে মহিলাবিষয়ক অফিস পটিয়া কর্তৃক ৮০ জন গরিব ও অসহায় মহিলার ভিজিডি কার্যক্রম চালু আছে। ২০২৩ ও ২০২৪ চক্রে প্রতিটি ভাতাভোগীর মাসিক ২২০ টাকা ব্যাংক জমা স্লিপ দেখিয়ে বিনামূল্যে ৩০ কেজি চাল গ্রহণ করার সরকারি নিয়ম আছে; কিন্তু মনছুর আলম ওই নিয়ম না মেনে নিজেই ভাতাভোগী মহিলা থেকে নগদ মাসিক ২২০ টাকা গ্রহণ করেন; কিন্তু ওই টাকা ভাতাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করেনি। সেই হিসাবে ২০২৩ সালে দুই লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা, ২০২৪ সালে দুই লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা, ২০২৫ সালে বর্ধিত আরো ছয় মাসের চাল ভিজিডি ভাতাভোগী পেয়েছেন, ওই সময়ে (জানুয়ারি ২৫ থেকে জুন ২৫) মাসিক সঞ্চয় টাকা ভাতাভোগী থেকে না নেয়ার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও মনছুর আলম ২২০ টাকা হারে এক লাখ পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা নিয়েছেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিজিডি খাতে সর্বমোট পাঁচ লাখ ২৮ হাজার টাকা ভাতাভোগীর অ্যাকাউন্টে জমা না করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, উন্নয়ন সহয়তা তহবিলের (২০২২-২০২৩) অর্থবছরে চার লাখ ১৮ হাজার ৪৫৫ টাকা, তিন লাখ পাঁচ হাজার ২০০ টাকা, (২০২৩-২০২৪) অর্থবছরে তিন লাখ ৮৬ হাজার ৬০০ টাকা, চার লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা, (২০২৪-২০২৫) অর্থবছরে চার লাখ ৬৪ হাজার ৯০০ টাকা, চার লাখ ৭৭ হাজার ৭০০ টাকা, প্রকল্প মাস্টার রোল, চুক্তিপত্র ও সরকারি নির্ধারিত ভ্যাট জমা করা হয়নি এবং পরিষদে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া ভূমি হস্তান্তর করবাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা, প্রকল্প মাস্টার রোল, চুক্তিপত্র ও সরকারি নির্ধারিত ভ্যাট জমা করা হয়নি এবং পরিষদে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত মনছুর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, বড়লিয়া ইউনিয়নের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আমি গিয়েছিলাম; কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের লোকজন আমার ওপর হামলা করেছিল। সে জন্য সরাসরি বুঝিয়ে দিতে পারিনি। তিনি প্রথমে বলেন, আমি কোনো টাকা নিয়েছি কথাটা সঠিক না, টাকা জমা হয় এনজিও এবং ব্যাংকে, সেটি ওনাদের বিষয়। কিন্তু পরক্ষণেই বলেন, আমার কাছে যেগুলো দিয়েছে সেগুলো আমি জমা করে দিয়েছি। সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের কোনো প্রকল্পের টাকা উঠানোর প্রচেষ্টার কথা তিনি অস্বীকার করেন। কোর্ট বিল্ডিং শাখা থেকে টাকা উত্তোলনের কথা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে বলেন, ইউএনও স্যার আমাকে দিয়ে উঠিয়েছেন।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, উনি এখানে এসেছেন দেড়/দুই মাস হলো। এর আগে পটিয়াতে থাকাকালে ৪০/৫০ লাখ টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। বাজালিয়ায় আমরা টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। কাস্টডিয়ান হচ্ছেন ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি। তিনি এক মেম্বরের নাম দিয়ে টাকা উঠিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টে নিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু সেই টাকা উঠানোর পর আর ব্যাংকে জমা করার সুযোগ নেই যেহেতু সেটি উইথড্র হয়েছে। যারা কাজ পেয়েছে আমরা তাদেরকে দেয়ার উদ্যোগ নিই। তিনি জানান, উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা (ডিডিএলজি স্যারের অনুমোদনবিহীনভাবে আমাদের কাছে কোনো ফাইল না পাঠিয়ে এমনকি উপজেলা প্রকৌশলীরও প্রাক্কলন নেই) তুলে নিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে। ব্যাংক আমাদের কাছে এই টাকা যে তোলা হচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো কিছু জানতেও চায়নি। যেখানে আমি ৫০ হাজার টাকা তুলতেও ব্যাংক থেকে জিজ্ঞেস করে সেখানে এতগুলো সরকারি টাকা উত্তোলন করা হলো। এ বিষয়টি আমরা তখন জানতে পারি যখন মেম্বররা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ চাচ্ছিল তখনই খোঁজ নিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে তাকে জিজ্ঞাসা করলে প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে একপর্যায়ে স্বীকার করেন টাকা উত্তোলনের কথা। তিনি জানান, ডিসি অফিসে আমরা অভিযোগ পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন পর্যন্ত কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে এরই মধ্যে তাকে শোকজ করা হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেয়া হবে।



