গ্যাস সরবরাহে হ-য-ব-র-ল অবস্থা কবে কাটবে নিশ্চিত নন কেউই

এক্সিলারেটের টার্মিনাল চালু না হতেই সামিটের সরবরাহ অর্ধেকেরও কম

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম

গ্যাস সরবরাহ নিয়ে যেন হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে। দীর্ঘ এক মাসের বেশি সময় পর গতকাল রোববার থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস মিললেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এ অবস্থা কবে স্বাভাবিক হবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেননা কেউই। এক্সিলারেট টার্মিনাল হতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ শুরু না হতেই সামিটের টার্মিনাল হতে সরবরাহ অর্ধেকের বেশি কমিয়ে ২৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে আনা হয়েছে। অথচ এর আগেরদিনও সার্মিটের টার্মিনাল ৫৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করেছে। এক্সিলারেট টার্মিনাল হতেও ক্যাপাসিটির চাইতে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট কম সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলা বলছে নতুন জাহাজ আসা পর্যন্ত সরবরাহ চালিয়ে যেতে দুই টার্মিনাল থেকে ব্যালেন্স করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান সংকটের সুরাহা না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। অনেকের অভিযোগ, সরকার গ্যাসের দাম বাড়াতেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, গত শনিবার মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহি এলএনজি ট্যাংকার ‘ফ্ল্যাক্স কারেজাস’ জাহাজ মহেশখালীতে এক্সিলারেটের ভাসমান এমএলএনজি টার্মিনালে ভিড়ে। জাহাজটি থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর শুরু হলে রাতেই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কিন্তু কিছু সময় না যেতেই সক্ষমতার চাইতে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি বেশি সরবরাহ দিয়ে আসা সামিটের টার্মিনালের সরবরাহ ২৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। নতুন যে জাহাজ আসবে সেটা সামিটের টার্মিনালেই ভিড়বে বলে সুত্র জানিয়েছে।

সুত্র বলছে প্রতিমাসে যেখানে ১০/১১ জাহাজ এলএনজি লাগে চলতি মাসে সেখানে এসেছে ৫টি জাহাজ। আরও একটি জাহাজ আসার কথা বলা হলেও বাকি জাহাজগুলোর এখনো কোন নিশ্চয়তা মেলেনি। ফলে এই সংকট কবে নাগাদ ঠিক হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের নিকট হতে এলএনজি সংগ্রহ করে। এছাড়া সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়াত্ব প্রতিষ্ঠান আরামকো ট্রেডিং এসএ’র সঙ্গে স্বল্পমেয়াদী জিটুজি চুক্তিও রয়েছে। এর বাইরে পেট্রোবাংলার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্য থেকে দরপত্রের মাধ্যমে খোলাবাজার থেকেও এলএনজি কেনা হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো বলছে, সংকট কাটাতে দরপত্র ছাড়াই ডিপিএম(সরাসরি ক্রয়) পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানির ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব জাহাজের সিডিউল নিশ্চিত করা যায়নি।

জনভোগান্তির সাথে মানুষের অস্বস্তি বাড়ছে

এদিকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় দেশের শিল্প কারখানার উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে। গণপরিবহন চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘিœত, বন্ধ রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাসাবাড়ির রান্না। আর গ্যাস সংকটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটও এখন নিত্যসঙ্গী হয়েছে মানুষের। দীর্ঘ লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছেনা সিএনজি চালিত গাড়িগুলোর। ফলে গণপরিবহণে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে স্বল্প দুরত্বের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ ও বেশি দুরের যাত্রায় দেড়গুণ। একমাসের অধিক সময় ধরে এমন সংকটে জনমনে অস্বস্তি বাড়ছে। সিএনজি ট্যাক্সী চালকদের কাছে বদ্ধমুল ধারণা যে- সরকার পরিকল্পিতভাবে সংকট সৃষ্টি করে একদিকে বেসরকারী এলপিজি আমদানিকারকদের একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। যদিও পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট কেউই এ ধরনের মন্তব্য মানতে নারাজ।

এ ব্যাপারে এলএনজি টার্মিনালে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার কর্মকর্তারা জানান তাদের কথা বলতে বারণ আছে। অন্যদিকে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের কোন কর্মকর্তাই ফোন রিসিভ করেননি।

পেট্রোবাংলার ডিজিএম(জনসংযোগ) তারিকুল ইসলাম খান নয়াদিগন্তকে বলেন,্আগামী ২৬ আগষ্ট একটি এলএনজি কার্গো জাহাজ পৌঁছার কথা রয়েছে। এর মধ্যে যাতে সামিট টার্মিনালের স্টক শেষ হয়ে না যায় সেজন্য দুইটা মিলে ব্যালেন্স করা হচ্ছে। গতকাল রোববার দু’টি টার্মিনাল থেকে সাড়ে ৭শ’ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে বলে তিনি জানান।

প্রসঙ্গত: গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেটের এমএলএনজি টার্মিনালে অগ্নি দুর্ঘটনার পর সারাদেশে গ্যাসের সরবরাহ নাজুক পর্যায়ে পৌঁছে। ইতোমধ্যে টার্মিনালটি সচল করা হলেও মাঝে এলএনজির মজুদ না থাকায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত শনিবার রাত থেকে টার্মিনালটি থেকে এলএনজি সরবরাহ শুরু হলেও সামিটের টার্মিনাল হতে সরবরাহ আবার কমানো হয়।