হবিগঞ্জে যেতে পথে পথে বাধার মুখে নাহিদ-হাসনাত-সারজিস

পুলিশের বিরুদ্ধে সড়কে ট্রাক রেখে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ

Printed Edition
এনসিপির গাড়িবহর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছালে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে : পিআইডি
এনসিপির গাড়িবহর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছালে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে : পিআইডি

ঢাবি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

হবিগঞ্জসহ সম্প্রতি কয়েকটি জেলায় এনসিপির গাড়িবহর ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এসেছে। এসব ঘটনায় এনসিপি ও বিএনপির রাজনৈতিক বিরোধ আরো বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার হবিগঞ্জে উভয় দলের ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। ফলে কোনো পক্ষই সমাবেশ করতে পারেনি। তবে এনসিপির অভিযোগ, হবিগঞ্জে প্রবেশের পথে একাধিক স্থানে তাদের শীর্ষ নেতাদের গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ। প্রশাসনের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি চলাকালে দলটির গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। এনসিপির অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালায়। এতে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম আহত হন। হামলায় এনসিপির মিডিয়া টিমের একটি মাইক্রোবাসও ভাঙচুর করা হয় বলে দাবি করেছে দলটি। তবে বিএনপি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

হামলার প্রতিবাদে বুধবার হবিগঞ্জে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে এনসিপি। একই সময়ে বিএনপিও কর্মসূচি ঘোষণা করলে সংঘর্ষের আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন এবং পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়। হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন স্থানে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে বুধবার সন্ধ্যায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে এনসিপির নেতাকর্মীরা।

মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের গাড়িবহরকে শ্রীমঙ্গলসহ একাধিক স্থানে পুলিশ আটকে দেয় বলে অভিযোগ করেছে দলটি। এনসিপির দাবি, নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের হবিগঞ্জে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। এনসিপির মিডিয়া উপকমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাত বলেন, নেতৃবৃন্দের গাড়িবহর একটি ব্রিজের ওপর ট্রাক রেখে আটকে দেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। তবে পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এ পদক্ষেপ।

হবিগঞ্জের ঘটনার পরদিন নেত্রকোনায় বিক্ষোভ সমাবেশ করে এনসিপি। দলটির অভিযোগ, ২৪ জুলাইয়ের পদযাত্রায় অংশ নেয়া ব্যক্তিদের হুমকি দেয়া হয় এবং ২৭ জুলাই রাতে কেন্দ্রীয় সংগঠক সোহাগ মিয়া প্রীতম ও তার সহযোগীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় হেনা আক্তার নামে এক ভুক্তভোগী মামলা করেছেন। নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের জানিয়েছেন, অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

২৫ জুলাই ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় এনসিপির পদযাত্রাকে ঘিরেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে নোয়াখালীর হাতিয়া এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরেও এনসিপি ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষ বা কর্মসূচিতে বাধার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার জন্য দুই দলই পরস্পরকে দায়ী করে আসছে।

এনসিপির নেতারা দাবি করছেন, দল গঠনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের পদযাত্রা, গণসংযোগ ও পথসভায় বাধা দেয়া হচ্ছে। অন্য দিকে বিএনপির বক্তব্য, সংঘর্ষের জন্য এনসিপির উসকানিমূলক বক্তব্যই দায়ী এবং রাজনৈতিক ইস্যু তৈরির উদ্দেশ্যে দলটি এসব অভিযোগ সামনে আনছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ের এসব সঙ্ঘাতের পেছনে জাতীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতাও প্রভাব ফেলছে। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান মাঠের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে। তবে তারা মনে করেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতার পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংযমী আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকার মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, নতুন রাজনৈতিক দলের জন্য সমান রাজনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ। কর্মসূচিতে হামলা বা শারীরিক আক্রমণের অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সংযমী আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। সিলেট মহানগর জামায়াতের নিন্দা

সিলেট ব্যুরো জানায়, মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রা এবং যশোরে জামায়াত এমপির বাড়িতে বিএনপি ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিলেট মহানগর জামায়াত নেতারা। তারা অবিলম্বে এসব হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

গতকাল সিলেট মহানগর জামায়াতের প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নিন্দা জানিয়েছেন সিলেট মহানগরী আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, নায়েবে আমির ড. নূরুল ইসলাম বাবুল ও সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী।

বিবৃতিতে তারা বলেন, গত মঙ্গলবার বিকেলে হবিগঞ্জে এনসিপির শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা কর্মসূচিতে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বর্বর ও নৃশংস হামলায় জাতি বিস্মিত। গণরোষে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতন থেকে বিএনপি ও ছাত্রদল শিক্ষা নেয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো হবিগঞ্জে এনসিপি নেতাদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রমাণ করেছে তারা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পথে হাঁটছে। এর পরিণতি ভালো হবে না।

তারা আরো বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের মদদে স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদল সন্ত্রাসীরা মঙ্গলবার যশোর-৪ আসনের এমপি গোলাম রসুলের বাসায় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। এমপির এক মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ। এই ধরনের ন্যক্কারজনক হামলা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

ফেনীতে এনসিপির বিক্ষোভ

ফেনী অফিস জানায়, হবিগঞ্জে জুলাই পদযাত্রা শেষে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ফেনীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপি। বুধবার বাদ আসর জেলা আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত ও সদস্যসচিব শাহ ওয়ালী উল্লাহ মানিকের নেতৃত্বে শহরের প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ বের হয়। মিছিলটি শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক ও ট্রাংক রোড প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারের সামনে এসে শেষ হয়।

মিছিলে আরো ছিলেন, সিনিয়র যুগ্ম-সদস্য সচিব মুহাইমিন তাজিম, যুগ্ম-আহবায়ক এমদাদ হোসেন রাজিব, যুগ্ম সদস্যসচিব (দফতর) ওমর ফারুক, মিরাজ হোসেন, জেলা যুবশক্তির আহবায়ক পারভেজ আহমেদ, সদস্যসচিব জাহিদুল ইসলাম ও ছাত্রশক্তির আহবায়ক সোহরাব হোসেন শাকিল।

সাভারে বিক্ষোভ সমাবেশ

সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রায় হামলার প্রতিবাদে সাভারে গতকাল বাদ আসর ঢাকা জেলা উত্তরের উদ্যোগে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাভার মডেল মসজিদের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি ঢাকা আরিচা মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে সাভার সিটি সেন্টারের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এনসিপি ঢাকা জেলা উত্তরের সদস্যসচিব সালামত উল্লাহ রনি, গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক মফিদুল ইসলাম সাদ্দাম ও মনসুর আহসান খান সজিব প্রমুখ।