জটিলতা কাটাতে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ

বালাইনাশক শিল্পে নীতিগত সংস্কারের জোর দাবি

Printed Edition

শাহ আলম নূর

দেশের কৃষি উৎপাদনকে টেকসই ও রফতানিমুখী করতে বালাইনাশক শিল্পে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। সরকারও চায় আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে মানসম্মত বালাইনাশক উৎপাদন বাড়াতে। এমন প্রোপটে বালাইনাশক উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার দাবি জোরালো হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতিসহায়তা পেলে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যাগ্রোকেমিক্যাল শিল্পে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

তারা জানিয়েছেন, দেশের কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ীমূল্যে বালাইনাশক সরবরাহ, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির সুযোগ তৈরির ল্েয সরকার এ খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টাও একাধিক আলোচনায় কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর তাগিদ এবং স্থানীয় উৎপাদন সমতা বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে একক দেশনির্ভর নীতি কার্যকর রয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের উৎপাদনকারীদের দাবি, কিছু কিছু বালাইনাশকে মাত্র ০.০৩ শতাংশ সক্রিয় উপাদান প্রয়োজন হয়, আর বাকি প্রায় ৯৯ শতাংশ উপাদান স্থানীয় বাজার থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। এমনকি ১-২ দশমিক ৫ বা ৫ শতাংশ সক্রিয় উপাদান ব্যবহার করেও আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে দেশে বালাইনাশক উৎপাদন সম্ভব।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামাল একক উৎস থেকে আমদানির বাধ্যবাধকতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে উপাদান কেনা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কৃষককে বাড়তি দামে বালাইনাশক কিনতে হচ্ছে। উৎপাদনকারীদের মতে, যদি সিঙ্গেল সোর্স নীতি পরিবর্তন করে বিভিন্ন উৎস্য থেকে কাঁচামাল ক্রয়ের অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে একই মানের বালাইনাশক ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে উৎপাদন করা সম্ভব। এতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রফতানির সুযোগ তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এই নীতিতে পরিবর্তনের পে মত দিয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় হতাশ এ খাতের দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা) দ্রুত পদপে নেয়ার দাবি জানিয়েছে। বালাইনাশক শিল্পে আরেকটি বড় সমস্যা শুল্ক বৈষম্য। বর্তমানে রেডি-টু-ইউজ বালাইনাশক আমদানিতে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হলেও উৎপাদনকারীদের কাঁচামালের ওপর ৫৮ দশমিক ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে। এতে দেশীয় কারখানাগুলো কার্যত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে এবং অনেক েেত্র উৎপাদন বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাথে আলোচনা শেষে গত আগস্টে শূন্য শুল্ক যৌক্তিক বলে খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়। পরবর্তীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয় বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের তালিকা এনবিআরে পাঠানো হবে, যাতে আমদানি সহজীকরণ ও শুল্ক ছাড় সুবিধা দেয়া যায়। বামা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় তালিকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির অপোয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে এনবিআরকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় বালাইনাশক উৎপাদনে আরেক বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বন্দরে কাঁচামাল ছাড়করণে জটিলতা। উৎপাদনকারীদের শুল্ক রেয়াত ও কর অব্যাহতির সুবিধা থাকলেও প্রতিটি চালানের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও খামারবাড়ি থেকে এনওসি নিতে হয়। ফলে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বন্দরে কাঁচামাল আটকে থাকে, বাড়ে ডেমারেজ খরচ। এমন পরিস্থিতিতে শুল্ক রেয়াতের সুবিধা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। অথচ সরাসরি বালাইনাশক আমদানিকারকদের েেত্র কোনো এনওসি প্রয়োজন হয় না। উৎপাদনকারীরা বলছেন, বাধ্যতামূলক এনওসি তুলে দিয়ে পরে যৌথ কমিটির মাধ্যমে কাঁচামালের ব্যবহার তদারকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ এলডিসি দেশ হওয়ায় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের মতো বালাইনাশক শিল্পেও পেটেন্ট স্বত্ব প্রয়োগ বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু বাস্তবে পেটেন্ট জটিলতা দেখিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে একচেটিয়া সুবিধা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ না করেও বাজার দখল করে রাখছে। দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তারা এতে মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত হচ্ছেন। বামা দাবি করেছে, এলডিসি সুবিধা বহাল রেখে পেটেন্ট সংক্রান্ত বৈষম্য দূর করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বালাইনাশক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পেসটিসাইট টেকটিক্যাল অ্যাডভাইজারি কমিটিতে (পিটিএসি) বামার কোনো প্রতিনিধি না থাকায় শিল্পের বাস্তব সমস্যাগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় বামার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করলেও এখনো পিটিএসি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা- কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে আগ্রহী। বালাইনাশক উৎপাদনে নীতিগত সংস্কার হলে এটি দেশের কৃষি, শিল্প ও রফতানি- তিন েেত্রই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনই সময় নীতিগত বাধা দূর করে দেশীয় বালাইনাশক শিল্পকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর। এতে কৃষক উপকৃত হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল শিল্পে একটি রফতানিমুখী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে বলে তারা মনে করছেন।