ব্যাংকিং খাত : অর্থনীতির সবচেয়ে গভীর ক্ষত

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি ব্যাংকঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান- এখনো দুর্বল। প্রবাসী আয়, কৃষি ও রফতানি বৈদেশিক খাতকে কিছুটা স্থিতি দিলেও ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগের অনীহা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি ব্যাংকঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান- এখনো দুর্বল। প্রবাসী আয়, কৃষি ও রফতানি বৈদেশিক খাতকে কিছুটা স্থিতি দিলেও ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগের অনীহা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বাইরে থেকে দেখলে রিজার্ভ বেড়েছে, রেমিট্যান্স রেকর্ড করেছে, রফতানি বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতিও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। কিন্তু অর্থনীতির ভেতরের ইঞ্জিনে গতি সঞ্চার হচ্ছে না। নতুন কারখানা স্থাপন, যন্ত্রপাতি আমদানি, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় প্রতিটি সূচকেই সতর্কসঙ্কেত।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ব্যাংকিং খাত। ২০২৪ সালের মার্চে মোট ঋণের ১১.১১ শতাংশ খেলাপি ছিল। ২০২৫ সালের জুনে তা ৩৪.৪০ শতাংশে উঠে যায় এবং পরবর্তী সময়ে সামান্য ওঠানামার পরও ৩২ শতাংশের ওপরে অবস্থান করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাচিত অর্থনৈতিক সূচকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ-এর অনুপাত ৩৫.৭৩ শতাংশ এবং ডিসেম্বর শেষে ৩০.৬০ শতাংশ দেখানো হলেও পরবর্তী মার্চে তা আবার ৩২.২৬ শতাংশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে।

এই সংখ্যাগুলোকে শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। খেলাপি ঋণ বাড়ার অর্থ হলো ব্যাংকের সম্পদের বড় অংশ অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়, নতুন ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমে এবং ঝুঁকি নিতে অনীহা তৈরি হয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো- খেলাপি ঋণ শুধু পুরনো ঋণের হিসাব নয়; এটি নতুন ঋণপ্রবাহকেও প্রভাবিত করে। ব্যাংক যখন আগের ঋণ আদায় করতে পারে না, তখন নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হয়ে ওঠে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তাও অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন।

ফলে তৈরি হয় একটি দুষ্টচক্র-> খেলাপি ঋণ -> ব্যাংকের মূলধন দুর্বল -> নতুন ঋণ কমে-> বিনিয়োগ কমে -> উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে -> ব্যবসার আয় কমে -> নতুন খেলাপি ঋণ বাড়ে।

এই চক্র ভাঙা ছাড়া প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা কঠিন।

সরকারি ঋণ বাড়ছে, বেসরকারি খাত পিছিয়ে

এই সঙ্কটকে আরো তীব্র করছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা। জুন ২০২৬-এ বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৪৭ শতাংশে নেমে আসা এবং একই সময়ে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের প্রবৃদ্ধি ৩৪.৫১ শতাংশে ওঠা অর্থনীতিতে অর্থের ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।

সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমিত তহবিলের বড় অংশ যদি সরকার শোষণ করে নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমতে পারে। এটিই ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট-এর ঝুঁকি।

বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরো গুরুতর। কারণ নতুন কর্মসংস্থান মূলত বেসরকারি শিল্প, এসএমই, ব্যবসা ও সেবা খাতের মাধ্যমে তৈরি হয়। ব্যাংকঋণ না পেলে উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করবেন না; বিনিয়োগ না হলে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না।

অর্থাৎ ৪.৪৭ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি শুধু ব্যাংকের পরিসংখ্যান নয় এটি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির প্রশ্ন।

রেমিট্যান্সে স্বস্তি, বিনিয়োগে স্থবিরতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উপাত্তেও এই দ্বৈত চিত্র স্পষ্ট। ব্যাংকটির নিয়মিত অর্থনৈতিক সূচকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর তথ্য রয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭.৩৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমদানিও বেড়েছে, তবে শিল্পের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা তৈরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিতে দুর্বলতা রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে এখন সবচেয়ে বড় ভরসার নাম রেমিট্যান্স। ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। এটি বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়েছে, আমদানি পরিশোধের সক্ষমতা জোরদার করেছে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করেছে।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে- রেমিট্যান্সের অর্থনীতিতে প্রবাহ বাড়লেও তা কি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরিত হচ্ছে? উত্তরটি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়।

প্রবাসী আয় মূলত পরিবারভিত্তিক ভোগ, আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। ফলে রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে স্বস্তি দিলেও তার বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না যায়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হতে পারে না। বরং রেমিট্যান্স অর্থনীতির ওপর একটি ‘কুশন’ তৈরি করে যা সঙ্কটের অভিঘাত কমায়, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে না।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অর্থনীতি তখনই টেকসইভাবে শক্তিশালী হয়, যখন বৈদেশিক মুদ্রা আসে রফতানি, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীল সেবা ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের মাধ্যমে। শুধু শ্রম রফতানি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।

রিজার্ভ: স্বস্তি আছে, নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই

মোট রিজার্ভ ৩৬.৫০ বিলিয়ন ডলারে ওঠা ইতিবাচক। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের চিত্র বুঝতে বিপিএম৬ হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। সেই হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ অনেক কম।

এখানেই নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল বার্তা রিজার্ভের সংখ্যাগত বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার গুণগত মান এবং আমদানি পরিশোধের সক্ষমতা আরো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, ডলার সঙ্কট এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হলে তা শুধু মুদ্রাবাজারে নয়, শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি, কাঁচামাল সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলে।

অতএব রিজার্ভ বাড়াকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু এটিকে সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রফতানি বাড়ছে, কিন্তু আমদানির কাঠামোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

রফতানি আয় ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো এবং ৭.৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু আমদানি ব্যয় ৬৪.৩৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বড়। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কী আমদানি হচ্ছে?

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতার অন্যতম প্রধান সূচক হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। কারখানায় নতুন মেশিন বসছে কি না, বিদ্যমান শিল্পে প্রযুক্তি আপগ্রেড হচ্ছে কি না, নতুন শিল্প স্থাপনের প্রস্তুতি হচ্ছে কি না এসবের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই খাতের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি ২৫.৪২ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকটির মাসিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি ১.৯৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসার তথ্য রয়েছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ২.৬৬২ বিলিয়ন ডলার।

এটি শুধু আমদানি কমার পরিসংখ্যান নয়; এটি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা।

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন নতুন মেশিন আমদানি করে না, তখন তার অর্থ হতে পারে নতুন উৎপাদন লাইন স্থাপন হচ্ছে না, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে না কিংবা উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ চাহিদা ও নীতিগত পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চিত।

অন্য দিকে শিল্পের কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তি ৮.৩৭ শতাংশ বাড়ার অর্থ হলো বিদ্যমান শিল্পের একটি অংশ উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির সমস্যাটি তাই পুরোপুরি ‘উৎপাদন বন্ধ’ নয়; বরং ‘নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি না হওয়া’।

এটাই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের স্বস্তি ফেরেনি

মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থানের পর জুলাইয়ে ৮.৩২ শতাংশে নামা কিছুটা স্বস্তির খবর। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ দাম কমে যাওয়া নয়; দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমা।

গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়েছে। ফলে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি কমলেও পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আগের অবস্থায় ফেরেনি।

এখানে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের আয় যদি মূল্যস্ফীতির তুলনায় দ্রুত না বাড়ে, তাহলে কাগজে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাস্তবে জীবনযাত্রার চাপ কমে না।

এই কারণেই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ‘বাস্তব আয়’কে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।

সঞ্চয়পত্রে নেতিবাচক বিক্রি : মধ্যবিত্তের আরেক সঙ্কেত

জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ৬,০৬৩ কোটি টাকায় নেমে যাওয়া অর্থনীতির ভেতরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত।

সঞ্চয়পত্র সাধারণত মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নিরাপদ সঞ্চয়ের একটি প্রধান মাধ্যম। সেখানে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে পুরনো সঞ্চয় ভাঙার প্রবণতা দেখা দিলে বোঝা যায়, পরিবারগুলোর ওপর নগদ অর্থের চাপ বাড়ছে।

অর্থাৎ মানুষ শুধু বিনিয়োগ করছে না অনেকে সঞ্চয় ভেঙে ব্যয় মেটাচ্ছে।

এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার কমিয়ে দিতে পারে। আর অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় কমলে বিনিয়োগের জন্য দেশের নিজস্ব অর্থায়নের ভিত্তিও দুর্বল হয়।

রাজস্ব সংগ্রহে স্থবিরতা: রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার পরীক্ষা

এনবিআরের রাজস্ব আয় ৩,৭০,৮৭৫ কোটি টাকার মতো হলেও প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২৩ শতাংশ- এই চিত্র অর্থনীতির আরেকটি মৌলিক দুর্বলতা প্রকাশ করে।

রাজস্ব কম বাড়ার অর্থ শুধু সরকারের আয় কম হওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা, উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতা এবং সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের জায়গা সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকি।

এনবিআরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের মাসভিত্তিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করা হয়েছে; জুন ২০২৬ পর্যন্ত পূর্ণ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবও ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়েছে।

রাজস্ব কাঠামোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে রাষ্ট্রকে একই সাথে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় সামলাতে হয় সীমিত রাজস্ব দিয়ে।

কৃষি এখনো অর্থনীতির নিরাপত্তাবলয়

এই কঠিন পরিস্থিতিতে কৃষি খাত তুলনামূলকভাবে আশার জায়গা তৈরি করেছে। কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ ৪২,৮৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছে লক্ষ্যমাত্রার ১০৯.৮৩ শতাংশ বাস্তবায়ন এবং ১৪.৭৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। কৃষিঋণের আদায়ও বেড়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃষি শুধু খাদ্যসরবরাহ নিশ্চিত করে না; এটি গ্রামীণ আয়, কর্মসংস্থান এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।

শিল্প ও ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় স্থিতিশীলতা তৈরি করে। কিন্তু কৃষির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আবার দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষির পাশাপাশি শিল্প ও আধুনিক সেবা খাতকে দ্রুত প্রসারিত করতে হবে।

৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি: পুনরুদ্ধার, কিন্তু প্রত্যাবর্তন নয়

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৭.৩২ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৭.৮৮ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের ঘরে নেমে যাওয়ার পর ২০২৫-২৬ সালে ৪.১৪ শতাংশে ওঠার প্রাক্কলন করা হয়েছে।

বিবিএসের প্রকাশিত প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫-২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ৩,০২০ মার্কিন ডলার হতে পারে। ৪.১৪ শতাংশ অবশ্যই ৩ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধির তুলনায় উন্নতি। কিন্তু এটিকে অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধার বলা যাবে না।

কারণ প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও যদি কর্মসংস্থান না বাড়ে, প্রকৃত মজুরি না বাড়ে, বিনিয়োগ না বাড়ে এবং উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারিত না হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন শুধু ‘বেশি প্রবৃদ্ধি’ নয় উৎপাদনশীল, কর্মসংস্থানমুখী এবং বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি।

মূল সঙ্কট আসলে আস্থার

সব সূচক একসাথে দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সঙ্কট এখন শুধু ডলার বা মূল্যস্ফীতি নয়; এটি আস্থার সঙ্কট।

উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করছেন না কারণ ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ব্যাংকঋণ দিতে চাইছে না কারণ পুরনো ঋণ আদায় হচ্ছে না। ব্যাংকে টাকা থাকলেও বেসরকারি ঋণ বাড়ছে না। সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে কারণ রাজস্ব বাড়ছে না। আর পরিবারগুলো সঞ্চয় ভেঙে ব্যয় সামলাচ্ছে।=====

এই চারটি প্রবণতা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বিনিয়োগের দুর্বলতা -> কর্মসংস্থান কম -> আয় কম -> ভোগ ও সঞ্চয় দুর্বল -> ব্যবসার বিক্রি কম -> ব্যাংকঋণ পরিশোধে চাপ -> খেলাপি ঋণ বাড়ে -> ব্যাংকের ঋণদানের ক্ষমতা কমে -> বিনিয়োগ আরও কমে।

এই দুষ্টচক্র ভাঙাই এখন অর্থনৈতিক নীতির প্রধান কাজ।

সামনে কী করা জরুরি

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে সমস্যাকে আড়াল না করে প্রকৃত সম্পদের মান নির্ধারণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রয়োজনীয় মূলধন সংস্থান এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাজস্ব সংস্কার ছাড়া এটি সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পতনকে বিশেষ সতর্কসঙ্কেত হিসেবে দেখতে হবে। নতুন শিল্প, প্রযুক্তি আপগ্রেডেশন এবং রফতানি বৈচিত্র্যকরণে দ্রুত নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

চতুর্থত, রেমিট্যান্সকে শুধু ভোগের অর্থ না রেখে বিনিয়োগের অর্থে পরিণত করতে হবে। প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগ বন্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তহবিল, নিরাপদ রিয়েল এস্টেট ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে।

পঞ্চমত, রাজস্ব প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি বন্ধ করা ছাড়া রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে না।

সবশেষে, অর্থনৈতিক নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন, সঙ্কট সামলানোর নীতি থেকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নীতিতে যাওয়া।

শেষ কথা

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা। রেমিট্যান্স শক্তিশালী, রফতানি বাড়ছে, রিজার্ভ কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং কৃষি খাত স্থিতিশীলতা দিচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, বেসরকারি ঋণের স্থবিরতা, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির পতন, সঞ্চয়পত্রে নেতিবাচক বিক্রি এবং দুর্বল রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ‘সঙ্কট থেকে বেরিয়ে এসেছে’- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। বরং বলা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটের সবচেয়ে তীব্র পর্যায় কিছুটা সামলানো গেলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিনিয়োগের সঙ্কট এখনো কাটেনি।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশকে সময় কিনে দিয়েছে। কৃষি দিয়েছে নিরাপত্তা। রফতানি দিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু টেকসই প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে হলে এখন সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকিং খাত পরিষ্কার করতে হবে, বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি বাড়াতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো অর্থনীতি শুধু রিজার্ভ দিয়ে বাঁচে না; অর্থনীতি বাঁচে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়ার মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অধ্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে, দেশ রেমিট্যান্সনির্ভর স্থিতিশীলতা থেকে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধিতে কত দ্রুত যেতে পারে, তার ওপর।