নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্ঘাতের প্রতিদিনের শিরোনাম-হামলা, পাল্টাহামলা, উত্তেজনা-এই দৃশ্যপটের আড়ালে গড়ে উঠছে আরো গভীর এক বাস্তবতা। যুদ্ধের চরিত্র বদলে যাচ্ছে মৌলিকভাবে। সামরিক শক্তির প্রচলিত ধারণা, ব্যয় কাঠামো, প্রযুক্তির ভূমিকা- সবকিছুই যেন নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ামূলক অভিযানে যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা বিশ্বকে এক নতুন সামরিক যুগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া তার জিপিএস টকশোতে।
ড্রোনের ঝাঁক : যুদ্ধের নতুন মুখ
সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেহরানের প্রতিশোধমূলক অভিযানের প্রথম সপ্তাহেই উপসাগরীয় অঞ্চলে নথিভুক্ত হামলার প্রায় ৭১ শতাংশই ছিল ড্রোনের মাধ্যমে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো একটি দেশ মাত্র আট দিনে ১,৪২২টি ড্রোন এবং ২৪৬টি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের মুখে পড়েছে।
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সঙ্ঘাতের বিবরণ নয়; এটি যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা নির্দেশ করে। যেখানে আগে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বা ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ছিল প্রধান অস্ত্র, এখন সেখানে সস্তা, সহজলভ্য এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্য ড্রোন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
যুদ্ধের অর্থনীতির উল্টে যাওয়া সমীকরণ : যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে অর্থনৈতিক কাঠামোয়। একটি শাহেদ-ধরনের ড্রোনের খরচ আনুমানিক ৩৫ হাজার ডলার, অথচ তা ঠেকাতে ব্যবহৃত একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় চার মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, একটি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের দামে ১০০টিরও বেশি ড্রোন তৈরি করা সম্ভব।
কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্সের বিশ্লেষক মিচেল হরোউইটজ, এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন- ‘আমরা এখন যুদ্ধে ‘প্রিসাইস ম্যাস’-এর যুগে প্রবেশ করেছি।’ তার মতে, নির্ভুলতা এখন আর কেবল উন্নত প্রযুক্তির একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়; এটি এখন গণহারে উৎপাদনযোগ্য একটি ক্ষমতা।
এই পরিবর্তন যুদ্ধের অর্থনীতিকে একেবারে উল্টে দিয়েছে- আক্রমণকারী খরচ করছে হাজার, আর প্রতিরক্ষাকারী খরচ করছে লাখো ডলার।
নতুন সামরিক স্থাপত্য : ড্রোনের বাইরেও এক বিপ্লব
এই পরিবর্তন কেবল ড্রোনের বিস্তারে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি সমন্বিত সামরিক স্থাপত্যের উত্থান যেখানে রয়েছে-
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক লক্ষ্য নির্ধারণ
- বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইমেজারি
- স্থিতিশীল যোগাযোগব্যবস্থা
- সমন্বিত সেন্সর নেটওয়ার্ক
- সাইবার যুদ্ধসক্ষমতা
সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এমন একটি যুদ্ধব্যবস্থা, যার লক্ষ্য শুধু আঘাত হানা নয়, বরং সময়কে সঙ্কুচিত করা- শত্রুর প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আঘাত করা।
একটি পরীক্ষায় মার্কিন বিমানবাহিনী দেখিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ১০ সেকেন্ডের কম সময়ে সিদ্ধান্তমূলক বিকল্প তৈরি করতে পারে- যা মানবনির্ভর দলের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি।
‘সেরা অস্ত্র’ নয়, ‘বেশি ভালো অস্ত্র’-ভবিষ্যতের জয়ী কে?
পুরনো সামরিক তত্ত্ব বলত- যার কাছে সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র আছে, সেই জয়ী হবে। কিন্তু নতুন বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
আগামী দিনের যুদ্ধে জয়ী হবে সেই পক্ষ-
- যার কাছে পর্যাপ্ত সংখ্যক কার্যকর অস্ত্র থাকবে
- যা দ্রুত উৎপাদনযোগ্য
- তুলনামূলকভাবে সস্তা
- এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে সমন্বিতভাবে ব্যবহৃত
অর্থাৎ, অল্পসংখ্যক অত্যাধুনিক অস্ত্রের চেয়ে বেশি সংখ্যক ‘ভালো’ অস্ত্রই হয়ে উঠছে বিজয়ের চাবিকাঠি।
ইউক্রেন : নতুন যুদ্ধের পরীক্ষাগার
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে ইউক্রেনে। যুদ্ধের চাপে দেশটি দ্রুত অভিযোজনের এক নজির স্থাপন করেছে।
ইউক্রেনের ‘স্টিং’ ইন্টারসেপ্টর ড্রোন-
- দাম : প্রায় ২,০০০ ডলার
- গতি : ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার
- ভূপাতিত ড্রোন: ৩,০০০+ (২০২৫-এর মাঝামাঝি থেকে)
- উৎপাদন : মাসে ১০,০০০+
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করতেও সময় লাগছে মাত্র কয়েক দিন।
ডাটা : যুদ্ধের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ
এই নতুন যুদ্ধব্যবস্থায় ডাটার গুরুত্বও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ইউক্রেন তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের ডাটা মিত্রদের জন্য উন্মুক্ত করেছে, যাতে ড্রোন এআই আরো দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলে ফেডরভ জানিয়েছেন, তাদের কাছে লাখ লাখ ট্যাগ করা ছবি ও হাজার হাজার যুদ্ধ ফাইটের ডাটা রয়েছে-যা বিশ্বে অনন্য।
ফলে যুদ্ধের সবচেয়ে মূল্যবান আউটপুট এখন কেবল অস্ত্র নয়, বরং তথ্য।
উৎপাদন বনাম প্রতিরক্ষা : এক অসম লড়াই
ইউক্রেনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৪০৪টি ড্রোন তৈরি করছে এবং লক্ষ্য দিনে ১,০০০-এ পৌঁছানো। বিপরীতে, লকহিড মার্টিন ২০২৫ সালে মাত্র ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি করেছে।
এই তুলনা একটি গভীর সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়- প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, উৎপাদনের পরিসর ও গতি যদি কম হয়, তবে তা টেকসই নয়।
যুদ্ধের বিস্তার : সীমান্তের বাইরে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এই সামরিক বিপ্লবের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী-
- যুদ্ধক্ষেত্র আর নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না
- সৈন্যদের জন্য ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ধারণা দুর্বল হবে
- যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও শেষ করা কঠিন হয়ে উঠবে
- সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রও উন্নত যুদ্ধসক্ষমতা অর্জন করতে পারবে
পারমাণবিক ঝুঁকি : নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনা
ইসরাইলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনিউইজ (উধহহু ঈরঃৎরহড়রিপু) সতর্ক করে বলেছেন, এই সঙ্ঘাত ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ঠেলে দিতে পারে। তার মতে, অতীতে আলি খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সীমা অতিক্রম করেননি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্ব সেই নীতি থেকে সরে আসতে পারে।
কৌশলগত ভুলপাঠ : ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র অপারেশনাল সাফল্য পেলেও কৌশলগতভাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া সঠিকভাবে অনুমান করতে পারেনি। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের ধারণা ছিল, নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে- যা বাস্তবে হয়নি।
পরিস্থিতি এখন একটি সঙ্কটজনক মোড়ে দাঁড়িয়ে। যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তবে সঙ্ঘাত দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে- যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে। অন্যদিকে, কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পথও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ- দ্রুত, সস্তা এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ বিশ্বকে দেখিয়েছিল, প্রযুক্তি যুদ্ধকে নির্ভুল করতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা আরো একধাপ এগিয়ে- নির্ভুলতা এখন গণহারে উৎপাদনযোগ্য।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে- দ্রুতগতির, তথ্যনির্ভর, সস্তা কিন্তু ব্যাপক এবং ক্রমশ অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত। যে দেশ এই নতুন সমীকরণ বুঝে নিজেদের অভিযোজিত করতে পারবে, তারাই আগামী দিনের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে।



