নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের যোগদানের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ফিরেছে কর্মচঞ্চলতা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করেই সংস্থার হারানো ভাবমর্যাদা উদ্ধার ও স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
দীর্ঘ দিন কমিশন না থাকায় আটকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সংস্থার সামগ্রিক কার্যক্রম গতিশীল করতে মহাপরিচালক পর্যায়ের ও অন্য কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছে কমিশন।
দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ ১৬৭ দিনের শূন্যতার পর নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ায় দুদকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনরুদ্ধার করা। দীর্ঘ দিন ধরে জমে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলার অগ্রগতি, গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতির সাথে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিষয়ে নিরপে সিদ্ধান্ত নেয়ার ওপরই নির্ভর করবে নতুন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা। তারা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করা, অনুসন্ধান ও তদন্তে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা নতুন কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ২১ বছরের ইতিহাসে দুদক প্রশংসার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব ও দায়মুক্তির অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে বেশি। ফলে নতুন কমিশনের সামনে শুধু দুর্নীতি দমন নয়, দুদকের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনারও বড় দায়িত্ব রয়েছে। চলতি বছরের ৩ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করার পর কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে দুদক। এরপর দীর্ঘ ১৬৭ দিন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ শূন্য ছিল।
এই দীর্ঘ সময়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রম নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। কারণ দুদকের তদন্ত, অনুসন্ধান, মামলা, চার্জশিটসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের েেত্র কমিশনের অনুমোদন অপরিহার্য। ফলে কমিশন না থাকায় সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম থাকলেও নীতিগত ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের েেত্র স্থবিরতা বিরাজ করে।
চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসে জানুয়ারি মাসে ৯২টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৮৭টি এবং মার্চ মাসে ২৭টিসহ মোট ১৭৯টি অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়। ওই সময়ে জানুয়ারি মাসে ১৭টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৭টি এবং মার্চ মাসে ২০টি সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারি করা হয়। বছরের প্রথম তিন মাসে ৬৯১টি মামলা বা এফআইআর এবং ২২২টি চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এরপর কমিশন না থাকায় আর কোনো মামলা কিংবা চার্জশিট দাখিল হওয়ার সুযোগ মেলেনি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কমিশন ছাড়া দুদকের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য থাকার নজির নেই। দুদকের নতুন চেয়ারম্যান এ কে এম আসাদুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। দীর্ঘ দিন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
অপর কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান সাবেক অবসরপ্রাপ্ত সচিব। তিনি ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানা গেছে।
২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা জটিলতায় সব কমিশন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। মাত্র তিনটি কমিশন পূর্ণ মেয়াদ পালন করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়।
দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পিএস নিয়োগ
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার একান্ত সচিব নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দুদকের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগ থেকে পাওয়া অফিস আদেশ সূত্রে গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানা গেছে।
আদেশ অনুসারে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব, উপপরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) তামিম আল ইয়ামিনকে কমিশনার ড. মো: সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার একান্ত সচিব এবং উপপরিচালক (প্রতিরোধ-২) আশিকুর রহমান চৌধুরীকে কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।



