এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। হাসিনা ক্ষমতা থেকে উৎখাতের পর জামায়াত তার দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি, কল্যাণমূলক প্রচারণা এবং সেরা পারফরম্যান্স দিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক জনমতকে গুরুত্ব দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের একটি মতামত জরিপে জামায়াতকে সবচেয়ে ‘পছন্দসই’ দল হিসেবে স্থান দিয়ে বিএনপির সাথে দলটির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্বাভাস দেয়া হয়। জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা কল্যাণমূলক রাজনীতি শুরু করেছি, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি নয়। তিনি মেডিক্যাল ক্যাম্প উদ্যোগ, বন্যা ত্রাণ এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবারের জন্য সাহায্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যে গঠনমূলক রাজনীতি, জামায়াত এবং তার সহযোগীরা এখন করছে, তাতে মানুষ জামায়াতে ইসলামীর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখবে।
হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড বা কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এমনকি জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ও নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
‘আমরা নতুন কিছু চাই’
গত বছর জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। জামায়াত নতুন দল এনসিপির সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে দলটির ভাবমূর্তি আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ জালাল, যিনি ঢাকার একটি জনাকীর্ণ বাজারে ভ্যান থেকে নারকেল বিক্রি করেন, তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন কিছু চাই এবং নতুন বিকল্প হলো জামায়াত, তাদের একটি পরিষ্কার ভাবমূর্তি রয়েছে এবং তারা দেশের জন্য কাজ করে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ধর্মতত্ত্ববিদ শফি মো: মোস্তফা বলেন, হাসিনার শাসনামলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভের কারণে দলটির ‘স্বীকৃত, বাস্তববাদী প্রতিদ্বন্দ্বী’ থেকে ‘পুনর্বাসিত’ প্রতিদ্বন্দ্বীতে রূপান্তরিত হওয়ায় সাহায্য করেছে। আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ব্যাপক হতাশা তৈরি করেছে, যার ফলে জামায়াত ‘ইসলামকে সমাধান হিসেবে’ এই স্লোগান পুনরুজ্জীবিত করতে এবং নিজেকে একটি নৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রথমবারের মতো, জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনীত করেছে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। দলটি তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে যে তারা বাংলাদেশকে ইসলামী নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চায়। দলের নেতারা প্রকাশ্যে নারীদের সমান অধিকারের আশ্বাসও দিয়েছেন যদিও জামায়াত ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য কোনো নারীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের পর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে বরাদ্দ ৫০টি আসনের মাধ্যমে নারীরা প্রতিনিধিত্ব পেতে পারেন।
জামায়াতের মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন যে তার দল ‘ধর্মের নামে কোনো সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতার সাথে কখনো জড়িত ছিল না, কখনও সমর্থন করেনি।’
জোটের নেটওয়ার্ক
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের জুনিয়র জোটের অংশীদার জামায়াত দেশের বেশির ভাগ ইসলামপন্থী দলের সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। এটি গত বছরের শুরুতে নির্বাচনী প্রার্থীদের তালিকাভুক্ত করা শুরু করে, ভোটারদের অনুভূতি মূল্যায়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়োগ করে।
গত সপ্তাহে, জামায়াত বলেছে যে, তারা ১৭৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যার মধ্যে ৭৪টি আসন এনসিপি এবং অন্যান্য মিত্রদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। জোট থেকে একটি দল বেরিয়ে আসার পর আরো ৪৭টি আসন এখনো ভাগাভাগি করা বাকি।
জামায়াতের নির্বাচন প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাসেম যিনি হাসিনার শাসনামলে গুম হয়ে যাওয়ার পর আয়নাঘরে আট বছর আটক এবং অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন- বলেন, গত বছর এপ্রিল মাসে জামায়াত আমার সাথে যোগাযোগ করে। তারা আমাকে তথ্য দেখিয়েছে যে সারা দেশের মানুষ পুরনো দলগুলোর ওপর বিরক্ত এবং পরিবর্তন চায়। তারা বিশ্বাস করে যে একটি বাস্তব সুযোগ আছে এবং আমি জামায়াতে যোগ দিয়েছি। আমরা সবার সাথে ভারসাম্যপূর্ণভাবে সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কখনই কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়তে আগ্রহী নই। বরং, আমরা সবাইকে সম্মান করি এবং জাতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চাই। (সংক্ষেপিত)



