দেশের পোলট্রি শিল্পে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনা করে বাণিজ্যিকভাবে এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর চূড়ান্ত খসড়ায় এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী সপ্তাহের মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হতে পারে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খসড়া নীতিমালায় বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানিতে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কেবল গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং বাচ্চার তীব্র সঙ্কট দেখা দিলে ক্ষেত্র বিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও পশুরোগ আইন-২০০৫ এবং পশুরোগ বিধিমালা-২০০৮ সহ কঠোর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত কোনো দেশ থেকে আমদানির পথ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।
ব্রিডার্স ফার্মের উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমানে দেশে প্রতি সপ্তাহে প্রায় আড়াই কোটি এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা (ব্রয়লার, লেয়ার, সোনালি ও কালার ব্রয়লার) উৎপাদন হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় বেশি। নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই দেশে প্রায় ১২০টি প্রতিষ্ঠান বাচ্চা উৎপাদনে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশে এখন উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি। তাই আমদানির প্রয়োজন নেই, বরং দেশীয় উৎপাদন সুরক্ষা দেয়া জরুরি।’ এতে বিদেশ থেকে জীবন্ত বাচ্চার মাধ্যমে রোগবালাই প্রবেশের ঝুঁকিও কমবে।
নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন বোর্ড’ গঠনের প্রস্তাব। নীতিমালা অনুমোদিত হলেই এই বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বোর্ড পোলট্রি শিল্পের পরিকল্পিত উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত সমন্বয়ে তদারকি সংস্থা হিসেবে কাজ করবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করছে প্রান্তিক খামারিদের সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় বাজার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বাচ্চার দাম অস্বাভাবিকভাবে উঠানামা করে। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘খামারিরা যেন সঠিক সময়ে ন্যায্য দামে মানসম্মত বাচ্চা পান, সেটি নিশ্চিত করা আগে প্রয়োজন।’ তারা আশঙ্কা করছেন, আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হলে বাজারে বড়দের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হতে পারে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো: সাইফুল ইসলাম মনে করেন, আমদানি বন্ধের আগে সঙ্কটকালীন বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা থাকা জরুরি। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই নীতিমালা পোলট্রি শিল্পকে আরো সমৃদ্ধ ও কাঠামোগত জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।
নতুন নীতিমালায় বাচ্চার মানের ভিত্তিতে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে খামারিদের মানসম্মত বাচ্চা পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হবে। বিশ্লেষকদের মতে, একচেটিয়া প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও রোগ প্রতিরোধে সরকারের এই সিদ্ধান্ত সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



