দীর্ঘ ছয় বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ২০২৪ সালের ছাত্র অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। মোট ২৮টি কেন্দ্রীয় পদে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ২৭টি পদে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস, দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ এবং ছাত্র অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের সাথে নিবিড় সম্পৃক্ততা তাদের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী করে তুলেছে। ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এবারো পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে ছাত্রদল।
চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী এবারের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৯০ সালের নির্বাচনের স্মৃতি। সে বছর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকনের নেতৃত্বাধীন প্যানেল নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। ওই নির্বাচনে ডাকসু ও হল সংসদ মিলিয়ে ১৮৮টি পদের মধ্যে ১৫১টি পদেই জয়ী হয় ছাত্রদল। সংগঠনটির নেতারা মনে করছেন, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের যে অগ্রণী ভূমিকা ছিল, তার ফল যেমন তারা নির্বাচনে পেয়েছিল, তেমনি ২০২৪ সালের ছাত্র অভ্যুত্থানেও তাদের ভূমিকা এবারের নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে।
ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী ও ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ১৯৯০ সালে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল তাতে ছাত্রদলের বড় ভূমিকা ছিল; যার ফল ডাকসু নির্বাচনে তারা পেয়েছিল। সেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আবারো একটি ডাকসু পেতে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি নব্বইয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে ২০২৫-এর ডাকসুতে।
তিনি বলেন, একইভাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে একটা নিকৃষ্ট ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘ লড়াই চালিয়েছে ছাত্রদল। ১৬ বছর এ রাষ্ট্রের স্বার্থে, রাষ্ট্রের সঙ্কটময় মুহূর্তে, যারা রাষ্ট্রের সেবা করেছে, রাষ্ট্রের প্রশ্নে আপসহীন ছিল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ নির্বাচনেও শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলকে বিজয়ী করবে।
আবাসন সঙ্কট নিরসনের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আবিদ বলেন, ঢাবির বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে। মেস বা বাইরের হোস্টেলে থাকলে তাদের খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা অনেক পরিবার বহন করতে পারে না। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে বেঁচে থাকার জন্য একসাথে চার-পাঁচটি টিউশনি করতে হয়। এতে সারা দিনের বেশির ভাগ সময় টিউশনে ব্যয় হয়ে যায়, পড়াশোনার জন্য যথেষ্ট সময় মেলে না। আবাসন সঙ্কট দূর করতে পারলে শিক্ষার্থীরা মানসিক প্রশান্তি পাবে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারবে। আমাদের বড় বড় ভবন দরকার নেই। প্রয়োজন শুধু মাথার ওপর একটি ছাউনি আর পড়াশোনার জন্য সামান্য পরিবেশ। প্রয়োজনে টিনের চাল দিয়েও শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে তারা যেন দেশের নেতৃত্ব দিতে পারে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।
কার্জন হলের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, কার্জন হল, মোতাহার হোসেন ভবন, মোকাররম ভবনে ক্যান্টিন সমস্যা থেকে শুরু করে অনেক সমস্যা আছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ছাত্রদল প্যানেল প্রতিজ্ঞা করছে, নির্বাচিত হলে কার্জন হলকেন্দ্রিক যত সমস্যা আছে, সমাধান করা হবে।
ইশতেহারের পূর্বাভাস ও হল সংসদের প্রস্তুতি :
আগামী ২৬ আগস্ট ছাত্রদল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে বলে জানানো হয়েছে। তবে জিএস পদপ্রার্থী তানভীর বারী হামিম ব্যক্তিগতভাবে কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নারী হলগুলোতে জরুরি প্রয়োজনে ছোট আকারের মেডিক্যাল সেন্টার স্থাপন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টিচার্স ইভালুয়েশন’ পদ্ধতি কার্যকর করে শিক্ষকদের পাঠদানের মান বৃদ্ধি করা।
হল সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে তানভীর বলেন, হলগুলোতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বেশি। ইনশা আল্লাহ শুধু কেন্দ্রীয় সংসদে নয়, হল সংসদেও ছাত্রদলকে শিক্ষার্থীরা পূর্ণ প্যানেলে জয়ী করবে।
নির্বাচনী ইশতেহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ছাত্রদল এখনো ইশতেহার ঘোষণা করেনি। ২৬ আগস্ট ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় কাজ করব। মেয়েদের হলে শিক্ষার্থীরা রাত ১০টার পর বাইরে বের হতে পারে না। তাই জরুরি প্রয়োজনে নারী হলগুলোতে ছোট আকারে মেডিক্যাল সেন্টার যেন হয়, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তা ছাড়া একসময় দেশের বড় বড় সেক্টরের শীর্ষ পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা থাকত।
ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘হল সংসদে আমরা সবচেয়ে পরীক্ষিত ও ত্যাগী প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছি। আমরা আশাবাদী, হল সংসদেও ছাত্রদল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদে জয়ী হবে।’
ডাকসুতে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে যারা :
ডাকসুতে সহকারী সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক তানভীর হাদি আল মায়েদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ২৮টি পদে নির্বাচন হলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বীর সম্মানে গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদটি শূন্য রেখে তাকে সমর্থন দিয়েছে ছাত্রদল। তন্বী এই পদে ডাকসুতে নির্বাচন করছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ছাত্রদল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান সংগঠনের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
ডাকসুর অন্যান্য পদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে আরিফুল ইসলাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে এহসানুল ইসলাম, কমন রুম, রিডিং রুম ও ক্যাফেটোরিয়া সম্পাদক পদে চেমন ফারিয়া ইসলাম মেঘলা, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে মেহেদী হাসান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আবু হায়াত মো: জুলফিকার জিসান, ক্রীড়া সম্পাদক পদে চিম চিম্যা চাকমা, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে সাইফ উল্লাহ সাইফ, সমাজসেবা সম্পাদক পদে সৈয়দ ইমাম হাসান অনিক, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে আরকানুল ইসলাম রূপক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে আনোয়ার হোসাইন, মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক পদে মেহেদী হাসান মুন্নাকে মনোনয়ন দেয় ছাত্রদল। এ ছাড়া প্যানেলে সদস্য পদে জারিফ রহমান, মাহমুদুল হাসান, নাহিদ হাসান, হাসিবুর রহমান সাকিব, শামীম রানা, ইয়াসিন আরাফাত, মুনইম হাসান অরূপ, রঞ্জন রায়, সোয়াইব ইসলাম ওমি, মেহেরুন্নেসা কেয়া, ইবনু আহমেদ, শামসুল হক আনান ও নিত্যানন্দ পালকে মনোনয়ন দেয়া হয়। প্যানেল ঘোষণার পর ছাত্রদলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আনাসের কবর জিয়ারত করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আর এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় ছাত্রদলের নির্বাচনী কার্যক্
প্যানেল ঘোষণার পর রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, তারা বিশ্বাস করেন, সাহসী, মেধাবী ও বিচক্ষণ শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে ছাত্রদলের প্যানেলকে জয়ী করবেন। ছাত্রসমাজের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দীর্ঘদিন ধরে যারা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করেছেন, তাদেরই প্যানেলে মনোনীত করা হয়েছে।
হল সংসদে ছাত্রদল মনোনিত ভিপি-জিএস প্রার্থী যারা : হল সংসদ নির্বাচনের জন্য ১৮টি হলে প্যানেল ঘোষণা করেছে ছাত্রদল। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ এ প্যানেল ঘোষণা করে। মাস্টারদা সূর্যসেন হল সংসদে ছাত্রদলের প্যানেলে ভিপি হিসেবে মনোয়ার হোসেন প্রান্ত, জিএস পদে লিয়ন মোল্লাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। কবি জসীমউদ্দীন হলে ভিপি পদে মো: আবদুল ওহেদ, জিএস পদে সিফাত ইবনে আমিন; মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ভিপি হিসেবে মো: জাহেদুল ইসলাম, জিএস পদে যোবায়ের হোসেন; বিজয় একাত্তর হলে ভিপি পদে মো: সাজ্জাদ হোসেন, জিএস পদে মো: সাকিব বিশ্বাস; শেখ মুজিবুর রহমান হলে ভিপি পদে সাইফ আল ইসলাম দীপ, জিএস পদে রিনভী মোশাররফ; হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ভিপি পদে আবু জার গিফারী রিফাত, জিএস পদে মহিবুল ইসলাম আকন্দ; সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ভিপি পদে মো: ইমন মিয়া, জিএস পদে তাওহিদুল ইসলাম; স্যার এ এফ রহমান হলে ভিপি পদে রাকিবুল হাসান, জিএস পদে কাওসার হামিদ; শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ভিপি পদে হাসিবুর রহমান আসিফ, জিএস পদে নাজমুস সাকিব; জগন্নাথ হলে ভিপি হিসেবে পল্লব চন্দ্র বর্মণ, জিএস পদে সত্যজিৎ দাস; ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে আশিকুর রহমানকে ভিপি, রবিউল ইসলাম নাহিদকে।
এ ছাড়া ছাত্রীদের পাঁচটি হলের মধ্যে রোকেয়া হলে ছাত্রদলের প্যানেলে শ্রাবণী আক্তারকে ভিপি, আনিকা বিনতে আশরাফকে জিএস ও শ্রাবন্তী হাসান বন্যাকে এজিএস প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। শামসুন নাহার হলে তায়েবা হাসান বিথীকে ভিপি, রাবেয়া খানম জেরিনকে জিএস প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে সাদিয়া রশিদকে ভিপি, মালিহা অবন্তীকে জিএস ও জান্নাতুল ফেরদৌস ইতিকে এজিএস প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। কবি সুফিয়া কামাল হলে তাসনিয়া জান্নাত চৌধুরীকে ভিপি, তাওহিদা সুলতানাকে জিএস ও জাকিয়া সুলতানা আলোকে ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে শারমিন খানকে ভিপি ও জান্নাতুল ফেরদৌস পুতুলকে জিএস প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্বাভাস : কেমন হবে এবারের ভোটের লড়াই?
এবারের ডাকসু নির্বাচন কেবল ছাত্রদলের জন্য নয়, বরং সব ছাত্র সংগঠনের জন্যই একটি অগ্নিপরীক্ষা। ২০২৪ সালের ছাত্র অভ্যুত্থান ক্যাম্পাসের পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই বদলে দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট অবস্থান তৈরি হয়েছে, যা এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ছাত্রদলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে শিবিরের প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের প্যানেল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদ’। অন্য দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও পরিচিত মুখ উমামা ফাতেমার নেতৃত্বে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলও নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।



